দেশে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, এই বিপুলসংখ্যক মামলা ২ হাজার ৩০০ জন বিচারকের পক্ষে নিষ্পত্তি করা ‘পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ’। বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (সিএমএম) কনফারেন্স রুমে দুটি ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

৪৬ লাখের বেশি মামলা নিষ্পত্তি করা বিচারকদের ওপর অনেক সময় ‘অমানবিক চাপ’ সৃষ্টি করে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মহানগরগুলোতে এই চাপ আরও বেশি। তাই আমরা চিন্তা করছি, যেসব জেলায় মামলার চাপ বেশি, সেখানে এমন বিচারকদের পদায়ন করব, যাঁরা শুধু চাকরি করার জন্য নয়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিজম দেখাতে পারবেন। আমরা বাছাই করে সে রকম কর্মকর্তাদের আনতে চাই।’

কোনো কোনো জায়গায় দু-তিন ঘণ্টা আদালত পরিচালনার খবর পেয়েছেন বলে জানান মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীদের পক্ষ থেকে কিছুক্ষণ আগেও বলা হলো, কোনো কোনো আদালতে বিচারক আসেন বেলা ১১টায়, আবার দেড়টা-দুইটার মধ্যে কাজ শেষ করে চলে যান। যদি এমন কোনো জুডিশিয়াল অফিসার থাকেন, যিনি আয়েশ করে চাকরি করতে চান, তাঁদের জন্য আমরা ব্যবস্থা করতে পারব বলে আশা করি। তাঁদের এমন জায়গায় পদায়ন করা হবে, যেখানে আয়েশ করে চাকরি করা যাবে।’

আইন মন্ত্রণালয় যেকোনো শুভ পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দরজা সব সময় উন্মুক্ত। আমরা ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রটিকে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসার জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। এটি করতে হলে আপনাদের আরও সচেতন হতে হবে, যাতে মানুষ মনে না করে যে বাংলাদেশের বিচারকেরা ন্যায়বিচার করছেন না বা সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারদর্শী নন।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জুডিশিয়ারির জন্য সামনের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এআই। যখন এআইয়ের ওপর নির্ভর করে রায় লিখতে যাবেন, স্বাক্ষর-জবানবন্দি নেবেন, তখন ন্যায়বিচার পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।’

‘বিচারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে এআই’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জুডিশিয়ারির জন্য সামনের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এআই। যখন এআইয়ের ওপর নির্ভর করে রায় লিখতে যাবেন, স্বাক্ষর-জবানবন্দি নেবেন, তখন ন্যায়বিচার পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কারণ, এআই এখন এত নিখুঁতভাবে মানুষকে ক্লোন (নকল) করতে পারছে, এত নিখুঁতভাবে মানুষের কণ্ঠ নকল করতে পারছে, যা আগামী দিনে বিচারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

বিচারকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যাঁরা বিচারক হিসেবে বসেছেন, আপনারা ন্যায়বিচার করতে বসেছেন। সেই ন্যায়বিচারের জায়গাটি সচেতনভাবে রক্ষা করতে হলে, এআইকে মোকাবিলা করতে হলে ডিজিটাল খাতে আপনাদের আরও বেশি পারদর্শী হতে হবে। যুগের চাহিদা মেটাতে, যুগের সাথে তাল মেলাতে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য আপনারা প্রস্তুত আছেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’

মামলা দায়েরের আগেই যদি মধ্যস্থতার (মেডিয়েশন) মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে আদালতের ওপর চাপ কমবে বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এই কার্যক্রম আমরা ইতিমধ্যে ৩০টি জেলায় চালু করেছি এবং সেখানে সাফল্যের হার ৬২ শতাংশের বেশি। ১১টি আইনের অধীনে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে আমরা প্রি-ফাইলিং মেডিয়েশন (মামলার আগে মধ্যস্থতা) করছি। ফলে মামলা দায়েরের প্রবাহ যদি আমরা কমাতে পারি এবং আমাদের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা বিদ্যমান মামলা নিষ্পত্তিতে আরেকটু সময় ও নিষ্ঠা দেন, তাহলে আমার মনে হয়, এক বছরের মধ্যেই আমরা অনেক মামলা নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখতে পারব।’

অনুষ্ঠানে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম, ঢাকার মহানগর দায়রা জজ মো. শাহজাহান কবির, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী, জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জি পি ইকবাল হোসেনসহ আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং আদালত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।