দৃষ্টিহীনতাকে জয় করে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাওয়া অদম্য এক মানুষ এস এম সোহেল। ভুল চিকিৎসার কারণে একসময় হারিয়ে ফেলেছিলেন চোখের দৃষ্টি।
তবে এই আঘাত তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এস এম সোহেল বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের সাবেরা সোবহান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সোহেল সব ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার শিক্ষাজীবন শেষ করেন। এরপর যোগ দেন একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে। এরপর থেকে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সফলতার সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন। নিজে চোখে দেখতে না পেলেও, তার ভেতরের প্রজ্ঞা আর ভালোবাসার আলো দিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মনকে আলোকিত করছেন। ব্ল্যাকবোর্ড আর বইয়ের পাতা হয়ত তার চোখে ধরা দেয় না, কিন্তু পরম মমতা আর নিষ্ঠা দিয়ে তিনি ঠিকই শিক্ষার্থীদের মগজে ও মনে পাঠ পৌঁছে দেন। শিক্ষার্থীরাও তাকে শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন পরম অভিভাবক এবং অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে আপন করে নিয়েছে।
সাবেরা সোবহান বালিকা বিদ্যালয়টি মুখস্থ হয়ে গেছে অন্ধ শিক্ষক সোহেলের। স্কুলে ঢুকার পরই তিনি জানেন কোন দিকে কোন শ্রেণি কক্ষটি আছে। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীরা সোহেল স্যারের ক্লাস উপভোগ করেন। সোহেল প্রতিটি শ্রেণির সব শিক্ষার্থীকে নামে চেনেন, কণ্ঠস্বর শুনে ধরতে পারেন এটা কোন শিক্ষার্থী। চোখের দৃষ্টি না থাকলেও মনের চোখ দিয়ে তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অনুভব করতে পারেন, আর শিক্ষার্থীরাও তা বুঝতে পেরে তাকে উজাড় করে ভালোবাসে। ক্লাসে তার পড়ানোর জাদুকরী শৈলী আর পরম স্নেহের কারণে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার প্রতিটি কথার প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী থাকে। শিক্ষার্থীরা কেবল তার পড়া শোনেই না, বরং তাদের প্রিয় শিক্ষককে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করার জন্য সবসময় ব্যাকুল থাকে। বোর্ডে কিছু লেখার প্রয়োজন হলে কিংবা ডায়েরি গুছিয়ে রাখার মতো ছোটোখাটো কাজেও শিক্ষার্থীরা পরম শ্রদ্ধায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।
৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী বারিশা বলেন, সোহেল স্যার একজন ভালো মানুষ। তিনি নিয়মিত ক্লাসে আসেন। প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করে ক্লাস গুলো যেন সুন্দরভাবে নেওয়া যায়।
আফরিন নামে ৯ম আরেক শিক্ষার্থী বলেন, স্যারের পাঠদান পদ্ধতি খুবই ভালো। অন্য শিক্ষকদের থেকে অসাধারণ একটা বিষয় আছে উনার মাঝে। ইংরেজি একটি কঠিন একটি বিষয় মনে হয় শিক্ষার্থীদের কাছে, উনি যখন পড়ান তা সহজ মনে হয়। উনার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না।

শুধু শিক্ষার্থীই নয়, অন্য শিক্ষক সহকর্মীদের প্রিয় মানুষ এস এম সোহেল। সহকর্মীদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর আন্তরিক সহযোগিতাও এস এম সোহেলের এই দীর্ঘ পথচলাকে অনেক বেশি সহজ ও মসৃণ করে তুলেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাকে কেবল একজন সহকর্মী হিসেবেই দেখেন না, বরং তার এই অদম্য লড়াইকে গভীর শ্রদ্ধা করেন। যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাজে বা চলার পথে সহকর্মীরা সবসময় পরম মমতায় তার পাশে এসে দাঁড়ান। বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ, খাতা মূল্যায়ন কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তায় তারা সোহেল স্যারকে আন্তরিকভাবে সাহায্য করেন।
এস এম সোহেলের দীর্ঘদিনের সহকর্মী বাংলা বিভাগের শিক্ষক নিজাম উদ্দিন বলেন, সোহেল সাহেব চোখে না দেখলেও বিদ্যালয়ে তিনি একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা উনাকে খুব পছন্দ করেন। ক্লাসে উনার সময় জ্ঞান খুব ভালো। তিনি কোনো শিক্ষার্থীর কণ্ঠ একবার শুনলেই বুঝতে পারেন কে এই শিক্ষার্থী।
সাবেরা সোবহান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিল নাহার বেগম বলেন, এস এম সোহেল অন্তত মেধাবী একজন মানুষ। তার পাঠদানেও ভিন্নতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরাও উনাকে পছন্দ করেন। সহকর্মী হিসেবেও আমাদের সঙ্গে উনার ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
এস এম সোহেল বলেন, ইচ্ছে ছিল এই শিক্ষকতা পেশায় আসা। এই সমাজ এবং রাষ্ট্রকে কিছু দেওয়ার জন্যে শিক্ষকতা পেশাটাকে বেশি উপযোগী মনে করি। শিক্ষকতা পেশাকে খুব উপভোগ করি। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারাও আমাকে খুব ভালোবাসেন।
তিনি আরও বলেন, দেশে কোনো জায়গাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যে কর্মস্থল গুলো ঠিকভাবে তৈরি না। পর্যাপ্ত ব্রেইল বইয়ের ব্যবস্থাও নেই। ব্রেইল বই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যে একটি হাতিয়ার। বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে সব প্রকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য মানুষের সমান অধিকার এবং সুযোগ সুবিধা তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করছি।
১৯৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করা সোহেল শহরের নিউ মৌড়াইল এলাকার মিজানুল হকের এক মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে ২য়। ৫ম শ্রেণিতে পড়ার সময় বসন্তে আক্রান্ত হন তিনি। তখন দুই চোখে সমস্যা দেখা দিলে চক্ষু চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় সোহেলে দুই চোখের দৃষ্টি আজীবনের জন্যে হারান। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় অন্ধদের ব্রেইল পদ্ধতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় পড়ালেখা শুরু করেন। ওই স্কুল থেকেই এসএসসি পাশ করেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের উপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
পরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১০ সালের ৪ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বদলি হন। পরে সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সরাইলের অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও পুনরায় সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
আবুল হাসনাত মো. রাফি/এসজেডএইচ/এএসএম








