দুপুরে খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই ঘুমঘুম ভাব আসে, কাজে মনোযোগ কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে শুধু খাবার নয়, শরীরের জৈবঘড়ি, খাদ্যাভ্যাস ও পানিশূন্যতাও ভূমিকা রাখে। তবে কিছু সহজ অভ্যাস বদলালেই এ সমস্যা অনেকটা এড়ানো সম্ভব।
কেন আসে দুপুরের অলসতা?
দুপুরের পর শরীরের শক্তি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর একটি হলো শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম)। এ সময় শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমঘুম ভাব আসতে পারে।
যারা দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এ অনুভূতি আরো বাড়ে। কারণ শরীর স্থির অবস্থাকে বিশ্রাম বা ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরে নেয়। ফলে ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব সহজেই দেখা দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো খাদ্যাভ্যাস। বেশি চিনি বা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত এবং কম প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দ্রুত হজম হয়। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে আবার কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে দুপুরের দিকে। এর সঙ্গে যদি সকালের নাশতা বাদ দেওয়া বা পর্যাপ্ত পানি না পান করার অভ্যাস যোগ হয়, তাহলে দুপুরের ক্লান্তি প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
পুষ্টিবিদ টার্নার বলেন, “দুপুরের অলসতার অন্যতম বড় কারণ হলো অতিরিক্ত চিনি বা কম প্রোটিনযুক্ত খাবার। এসব খাবার প্রথমে শরীরে শক্তি বাড়ায়, পরে হঠাৎ করেই শক্তি কমে যায়।”
সমস্যার শুরু হয় সকালের নাশতা থেকেই
অনেকে মনে করেন, দুপুরের খাবারের কারণেই বিকেলে ঘুম পায়। তবে টার্নারের মতে, এ সমস্যার শুরু অনেক সময় হয় দিনের শুরুতেই। সকালের নাশতা না খাওয়া বা এমন খাবার খাওয়া, যা দীর্ঘ সময় শক্তি জোগাতে পারে না, শরীরকে শুরু থেকেই শক্তির ঘাটতিতে ফেলে।
তিনি বলেন, “আপনি যদি নিয়মিত সকালের নাশতা বাদ দেন বা ঠিকমতো না খান, তাহলে নিজের দিকে খেয়াল করুন। সব সময় পেটে ক্ষুধা লাগবে এমন নয়। সকাল ১০টার দিকে মাথা ঝিমঝিম করা, মাথাব্যথা বা দুপুরের আগেই বিরক্ত লাগাও ক্ষুধার লক্ষণ হতে পারে। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ক্ষুধার প্রকাশ এক রকম হয় না।”
সকাল থেকেই শরীরে শক্তির ঘাটতি থাকলে দুপুরের খাবার সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। ফলে বিকেলের সময়টা আরো ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। সকালের নাশতায় কী খাবেন?
বিশেষজ্ঞরা এমন খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যা দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। যেমন— • সবজি দিয়ে স্ক্র্যাম্বলড ডিম ও উচ্চ-প্রোটিন টরটিলা (চাইলে চিকেন সসেজ যোগ করা যেতে পারে) • বেরি ও গ্র্যানোলাসহ গ্রিক দই • প্রোটিন ওটমিল, বেরি এবং ফ্ল্যাক্সসিড
দুপুরের খাবারে কী রাখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকেলের কর্মশক্তি অনেকটাই নির্ভর করে দুপুরের খাবারের ওপর। চিপস, সাদা পাউরুটি বা কম প্রোটিনযুক্ত পাস্তার মতো অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে পরে কমিয়ে দেয়। ফলে ক্লান্তি বাড়ে। টার্নারের পরামর্শ, প্রতিটি দুপুরের খাবারে তিনটি বিষয় রাখা উচিত— • চর্বিহীন (লিন) প্রোটিন • পর্যাপ্ত শাকসবজি • পরিমিত পরিমাণ জটিল শর্করা (যেমন ব্রাউন রাইস, মিষ্টি আলু বা হোল গ্রেইন রুটি) তিনি বলেন, “দুপুরের খাবার গুছিয়ে নেওয়ার সময় ভাবতে পারেন, আপনার প্লেটটি কেমন হওয়া উচিত। এটি প্রতিটি খাবারের জন্য একটি সহজ চেকলিস্টের মতো। দুপুরের খাবারে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম প্রোটিন এবং ৫ থেকে ১০ গ্রাম ফাইবার রাখার চেষ্টা করুন। এতে হজম ধীরগতিতে হবে, রক্তে শর্করার ওঠানামা কমবে এবং বিকেল পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে।
এনার্জি ড্রিংক সমাধান নয়
অনেকেই দুপুরে ঘুমঘুম ভাব এলে এনার্জি ড্রিংক বা আরেক কাপ কফি পান করেন। তবে টার্নার মতে, এটি সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলোর একটি। তিনি বলেন, “এনার্জি ড্রিংক মূলত স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। এটি শরীরের জন্য প্রকৃত শক্তির উৎস নয়।”
যদি পানীয়টিতে অতিরিক্ত চিনি থাকে, তাহলে কিছু সময়ের জন্য শক্তি বাড়লেও অল্প সময় পর আবার ক্লান্তি ফিরে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কফি উপকারী হতে পারে, তবে তা তখনই কার্যকর, যখন শরীর আগে থেকেই পর্যাপ্ত পুষ্টি ও পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। এটি কখনোই খাবার বা পানির বিকল্প নয়।
পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি
দুপুরের ক্লান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো পানিশূন্যতা। অনেকেই এটি বুঝতে পারেন না। সামান্য পানিশূন্যতাও মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে, বিরক্তি তৈরি করতে পারে এবং শরীরকে ভারী ও ক্লান্ত অনুভব করাতে পারে।
টার্নার মতে, “ঘুমঘুম লাগলে নাশতা বা কফির আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আজ কি পর্যাপ্ত পানি পান করেছেন? প্রতিদিন কত কাপ কফি পান করেন আর কতটা পানি পান করেন, সেটিও হিসাব করুন। দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়।”
বিকেলের নাশতায় কী খাবেন?
সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার ঠিকমতো খেলেও অনেকের বিকেলে হালকা নাশতার প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে যেদিন শারীরিক পরিশ্রম বা মানসিক চাপ বেশি থাকে।
এ ক্ষেত্রে শুধু চিনিযুক্ত খাবার নয়, প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ নাশতা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন— • তাজা ফলের সঙ্গে চিজ • বাদাম (কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট) • টুনা বা স্যামনের প্যাকেট • বিফ, চিকেন বা টার্কি জার্কি • গ্রিক দই • উচ্চ-প্রোটিন বার (১৫–২০ গ্রাম প্রোটিনযুক্ত)
টার্নার পরামর্শ, অফিসের ডেস্কে এমন কিছু স্বাস্থ্যকর নাশতা মজুত রাখুন, যাতে প্রয়োজন হলে সহজেই খেতে পারেন।
দুপুরের অলসতা কাটানোর আরো কিছু উপায়
বিশেষজ্ঞরা আরো যেসব পরামর্শ দিয়েছেন— • কিছুক্ষণ হাঁটুন, স্ট্রেচিং করুন বা হালকা ব্যায়াম করুন। • কিছু সময় রোদে থাকুন। এতে শরীরের জৈবঘড়ি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। • কাজের সময় পছন্দের প্রাণবন্ত গান শুনতে পারেন। তবে খুব ধীরগতির বা ঘুমপাড়ানি গান এড়িয়ে চলাই ভালো। • রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরের পর নিয়মিত ক্লান্তি, শক্তির ঘাটতি বা কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হলে একজন নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তিনি খাদ্যাভ্যাস মূল্যায়ন করে জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই একটি পরিকল্পনা তৈরি করে দিতে পারবেন।
সূত্র: ফ্রান্সিসকানহেলথ



