২০২২ সালের কথা। আমেরিকার হিউস্টনের তরুণ হিফজ শিক্ষক তারিক কাজি প্রতিদিন একবার মায়ের সামনে বসে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। মা শুনতেন—কোথাও টান একটু কমে গেলে, কোথাও স্বরচিহ্নে সামান্য গরমিল হলেও তিনি বুঝতেন, শুধরে দিতেন। সে বছর পাকস্থলীর ক্যানসারে মা মারা যান।

পরের রমজানে কোরআন পড়তে বসে তারিক টের পেলেন, ভুল শুধরে দেওয়ার মতো কেউ তাঁর পাশে নেই। সেই শূন্যতা থেকে তিনি বেছে নিলেন ‘তারতিল’ এআই অ্যাপ, যা এখন তাঁর তিলাওয়াতের ভুলত্রুটি নিজে থেকে ধরিয়ে দেয়। সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিন তারিকের এই গল্প তুলে ধরেছে।

হিফজ যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন—কোরআন একবার মুখস্থ করলেই হয় না, বাকি জীবন তা ধরে রাখতে নিয়মিত পড়া চালিয়ে যেতে হয়। এ জন্য অনেকে দক্ষ কোনো কারির কাছে যান, কেউ আবার পরবর্তী মাদ্রাসা-জীবনে সহপাঠীর সঙ্গে পরস্পরকে শুনিয়ে শুনিয়ে পড়েন, যাকে বলে দাওর। কিন্তু যাঁরা মাদ্রাসার পরিবেশে থাকেন না, কর্মজীবনের ব্যস্ততায় তাঁদের জন্য নিয়মিত কাউকে শোনানোর সুযোগ করা কঠিন। মুঠোফোনের এআই অ্যাপ সেই সুবিধা দিচ্ছে—বাসে-মেট্রোতে কানে এয়ারপড গুঁজে অ্যাপের সঙ্গে অনেকে এখন ‘দাওর’ সারছেন।

তারিকের গল্পটা তাই একা তাঁর নয়, আরও অনেকের। এ বছর হজের দিনগুলোতে বিশ্বের ১৮০টির বেশি দেশের লাখো মুসলিম ধর্মীয় বিধান পালনে সঙ্গী করেছেন এআইকে। কারও পকেটে চলতি পথে মৃদু নোটিফিকেশন বেজে ওঠে—মহররমের রোজা রাখার কথা মনে করিয়ে দেয়। কেউ চলতি পথে দেখে নিচ্ছেন, ইমাম আজ যে আয়াত পড়ছেন তার অর্থ কী। এমনকি এত দিন যে প্রশ্নগুলো নিয়ে তিনি ইমামের কাছে যেতেন, সেই প্রয়োজন মেটাতে হাজির হয়েছে ‘ইউর ইমাম’ অ্যাপ, যেখানে এআই দিয়ে বানানো দাড়িওয়ালা একটা মুখের সঙ্গে চ্যাট করা যায়, যেন তিনিই তাঁর ‘ব্যক্তিগত ইমাম’।

মুসলিম সমাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই প্রবেশ এক নতুন বাস্তবতা। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযুক্তিবিদ ওয়ালিদ কাদুস ইসলামি উৎস থেকে প্রশিক্ষিত একটা এআই সহকারী বানিয়েছেন, নাম আনসারি; যা এ পর্যন্ত দেড় লক্ষাধিক প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। কোনো ইমাম তাড়াহুড়ায় জুমার খুতবার খসড়া চাইছেন, কেউ আবার জানতে চাইছেন শূকরের মাংসের পাশে রাখা প্লেট থেকে চিংড়ি খাওয়া জায়েজ কি না। প্রযুক্তির এই জোয়ার একদিকে যেমন ধর্মীয় জ্ঞানকে হাতের কাছে এনে দিচ্ছে, অন্যদিকে ইসলামি চিন্তাবিদদের ফেলে দিয়েছে নতুন এক দার্শনিক প্রশ্নের মুখে।

ফতোয়া এখন কার নিয়ন্ত্রণে

আলেমরা প্রশ্ন তুলছেন—এআই কি আদৌ ইসলামি আইনের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম? সম্প্রতি এক গবেষণায় কয়েকটা এআই মডেলের ইসলামি উত্তরের মান যাচাই করা হয়েছিল।

দেখা গেছে, জিপিটি-৪ও নির্ভুলতা ও উদ্ধৃতির মানে সবচেয়ে ভালো, তার পরে আনসারি, আর ‘ফানার’ নামের আরেকটা মডেল একটু পিছিয়ে। তবে সবচেয়ে ভালো ফল করা মডেলগুলোও নিখুঁতভাবে বিষয়বস্তু ও উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে। অবশ্য শিয়াকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম ‘উইসকু’ বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, তারা নাকি ৯৬ শতাংশ নির্ভুল ধর্মীয় উত্তর দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা থিঙ্কট্যাংক মিডল ইস্ট ফোরাম (এমইএফ) সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—এআইয়ের এই যুগে ফতোয়া আসলে কার নিয়ন্ত্রণে থাকছে?

প্রশ্নটা বোঝার জন্য একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে কোনো ধর্মীয় প্রশ্নের জবাব পেতে চাইলে যেতে হতো স্বীকৃত ও যোগ্য আলেমের কাছে। ফতোয়া কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করত উত্তরটা কত দ্রুত এল তার ওপর নয়, বরং কে দিচ্ছেন তাঁর নির্ভরযোগ্যতার ওপর। আর এই নির্ভরযোগ্যতা তৈরি হয় একটি দীর্ঘ সিলসিলা থেকে।

দেড় হাজার বছর আগে হেরা গুহায় ফেরেশতা জিবরাইল মহানবী (সা.)-কে একাধিকবার বলেছিলেন, ‘পড়ুন’। তিনি প্রতিবার জানান যে তিনি পড়তে পারেন না। তখন ফেরেশতা তাঁকে বুকের সঙ্গে মিলিয়ে চাপ দেন, আর সেই মুহূর্তে তাঁর ভেতর প্রবেশ করে খোদায়ি জ্ঞান। আলেমরা মনে করেন, ওহি-লব্ধ জ্ঞান এভাবে হৃদয় থেকে হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়—একে বলা হয় ‘সিনা-বসিনা’। শুধু লেখাপড়া জানলে হয় না, শাস্ত্রীয় জ্ঞান বিতরণের জন্য ‘সনদ’ বা পরম্পরা রক্ষা করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। যাঁর সনদ যত শক্ত, তিনি আলেম, ফকিহ বা হাদিসবেত্তা হিসেবে তত ‘সিকা’ বা নির্ভরযোগ্য।

এত দিন কোনো মাসআলা জানতে চাওয়ার প্রক্রিয়াটা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক—কেউ আলেমের কাছে যেতেন, কেউ টিভি বা ইউটিউবে দেখে সমাধান পেতেন। উত্তরটা কে দিচ্ছেন, সেটা স্পষ্ট থাকত, ফলে দায়টাও ছিল তাঁর। কিন্তু এআই-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় কোনো আলেম, স্কলার বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাই থাকছে না। যাঁদের কর্তৃত্ব নির্ভর করত মানুষের আস্থা অর্জনের ওপর, সেই আস্থার দরকারই যদি না পড়ে, তাহলে তাঁরা প্রভাব ফেলবেন কীভাবে?

এআই এসে এই পুরো হিসাব গুলিয়ে দিচ্ছে। কোরআন-হাদিস-ফিকহের পাঠ্য ইন্টারনেটে অনেক আগেই যুক্ত হয়েছে বটে, কিন্তু তার অর্থ বা প্রয়োগ বুঝতে আলেমের কাছেই যেতে হতো। এআই চ্যাটবট এখন সেই ধাপটা পার করে দিচ্ছে—কয়েক মুহূর্তে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে, প্রয়োগ-অপপ্রয়োগও বাতলে দিচ্ছে—কোনো আলেমের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই।

আলেমদের আলোচনায় সাধারণত এআই-উত্তরের নির্ভুলতা নিয়ে বেশি কথা ওঠে। কিন্তু উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে আরও গভীর পরিবর্তন ঘটে গেছে; প্রযুক্তিবিদরা যাকে বলছেন অবকাঠামোগত কর্তৃত্ব (ইনফ্রাস্ট্রাকচার অথরিটি)। মানে, মানুষের কাছে কীভাবে ধর্মীয় জ্ঞানে পৌঁছাবে—সেই পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে এআই এবং এর মধ্য দিয়ে মানুষের ধর্মীয় আচরণে প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘকাল ধরে আলেমদের হাতে যে কর্তৃত্ব ছিল, তা এসেছিল ব্যাখ্যার ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ থেকে। এখন সেই অ্যাক্সেস উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় মানুষ কীভাবে ধর্ম পালন করবে, তা ঠিক করার লাগামটা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে যাঁরা এই প্রযুক্তি চালান, তাঁদের হাতে।

মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে

এত দিন কোনো মাসআলা জানতে চাওয়ার প্রক্রিয়াটা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক—কেউ আলেমের কাছে যেতেন, কেউ টিভি বা ইউটিউবে দেখে সমাধান পেতেন। উত্তরটা কে দিচ্ছেন, সেটা স্পষ্ট থাকত, ফলে দায়টাও ছিল তাঁর। কিন্তু এআই-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় কোনো আলেম, স্কলার বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাই থাকছে না। যাঁদের কর্তৃত্ব নির্ভর করত মানুষের আস্থা অর্জনের ওপর, সেই আস্থার দরকারই যদি না পড়ে, তাহলে তাঁরা প্রভাব ফেলবেন কীভাবে?

এই সংকটের শুরুটা অবশ্য আগেই হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যখন প্রথম ধর্মীয় আলোচনার জায়গা দখল করতে শুরু করেছিল। দেখা গেল—কার মতামত সবার আগে স্ক্রিনে দেখানো হবে, কোনোটা চাপা পড়বে, সেটা ঠিক করে দিচ্ছে অ্যালগরিদম। ফলে সনদের ভিত্তিতে অর্জিত নির্ভরযোগ্যতা বা বহু বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা তখন আর বিশেষজ্ঞ হওয়ার মাপকাঠি থাকল না। বরং যাঁদের কথা অ্যালগরিদম বেশি ছড়িয়ে দিল, তাঁরাই হয়ে উঠলেন প্রভাবশালী। এর ফলে অনেক উগ্র বা চরমপন্থী মতও সমাজে প্রভাব ফেলেছে, আর তুলনামূলক কম জ্ঞানসম্পন্ন কেউ কেউ রাতারাতি বিপুল অনুসারী জুটিয়ে নিয়েছেন।

এআই সেই পুরোনো সংকটকে এবার আরেক ধাপ এগিয়ে দিল। আগে যে কর্তৃত্ব আসত ব্যাখ্যার গভীরতা থেকে, এআইয়ের যুগে তা ক্রমেই রূপ নিচ্ছে বিতরণের ক্ষমতা থেকে।

শুধু কর্তৃত্বের প্রশ্ন নয়

উদ্বেগটা শুধু ধর্মীয় নেতাদের নয়, অনেক দেশের সরকারও চিন্তিত। সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটা বড় ভূমিকা থাকে বলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্র আলেম, মসজিদ ও ফতোয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি রাখে।

কিন্তু এআই এমন এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে, যা যেকোনো সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি মানুষের মাথার ভেতর ঢুকে পড়তে পারে। ফলে কার্যত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই এখন একধরনের নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে উঠছে। আর এই কোম্পানিগুলোর গড়ন যেহেতু পশ্চিমা উদারনৈতিক চিন্তার ওপর দাঁড়ানো, তাই একধরনের সাংস্কৃতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে, যা ধর্মীয় মৌলিক চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রশ্ন হলো—এআই কি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিচ্ছে? টাইম ম্যাগাজিনকে ওয়ালিদ কাদুস বলেছেন, বছরখানেক আগে পর্যন্ত চ্যাটজিপিটি অজুর নিয়মে ‘হাঁটু ধোয়া’র মতো ভুল তথ্য দিত, যা ইসলামি বিধানে নেই। কাদুসের কথায়, মূলধারার এই চ্যাটবটগুলো তাদের নির্মাতাদের মূল্যবোধই প্রতিফলিত করে।

যেমন টাইমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্যালিফোর্নিয়ায় বাস করতে আসা ২৬ বছর বয়সী তরুণী আমিনা বাসেন্তে নতুন পরিবেশে হিজাব পরার কারণে সামাজিক চাপ অনুভব করছিলেন। মানসিক সমর্থন পেতে তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে যান। চ্যাটবট তাঁকে পরামর্শ দিল, হিজাব যদি আপনার আত্মবিশ্বাসে বাধা দেয়, তবে কিছুদিনের জন্য সেটা খুলে দেখুন, এটা আপনাকে খারাপ মুসলিম বানাবে না, স্রেফ একটা বিকল্প পরখ করবেন।

হালালা সেন্টার: যৌনতার ফাঁদ নাকি ধর্মীয় সমাজের ল্যাবরেটরি টেস্ট

তাহলে—নিরপেক্ষতার ভান করে এআই কি আমাদের ঘরে ঢুকে আমাদের মূল্যবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে? ধর্মীয় জ্ঞান, যাকে বলা হয় ‘ইলমে ওহি’, তা কি সত্যিই সনদ বা হৃদয়ের সংযোগ ছাড়া কেবল স্ক্রিনের সঞ্চারিত হয়ে যথার্থ সমাধান দিতে পারে? কেননা, ইসলামি ঐতিহ্যে জ্ঞান অর্জন কখনোই শুধু তথ্যের লেনদেন নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষক-ছাত্রের আত্মিক সান্নিধ্য, সমাজের যৌথ বন্ধন, আর বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রজ্ঞা। তার প্রয়োজন কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?

আনসারির নির্মাতা ওয়ালিদ কাদুস এই উদ্বেগের কথা স্বীকার করে বলেছেন, ব্যবহারকারীরা প্রায়ই জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে তাঁর চ্যাটবটকে পথপ্রদর্শক হিসেবে ব্যবহার করতে চান। মানুষ জিজ্ঞেস করে, এই কঠিন সময়টা নিয়ে ইসলাম কী বলে। এমন প্রশ্নের জবাব তো একজন ইমামের কাছ থেকেই আসা উচিত।

অনেকে অভিযোগ করছেন, ইসলামি জ্ঞানের জন্য তৈরি এআই ব্যবস্থাগুলো যথেষ্ট যোগ্য স্কলারদের যুক্ত না করে গড়ে উঠছে। হাদিসে এসেছে, শেষ জামানায় ইলম তুলে নেওয়া হবে, আলেমশূন্য পৃথিবীতে মানুষ মূর্খকে নেতা বানাবে, আর তারা না জেনেই ফতোয়া দেবে—এতে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০০)

পাশাপাশি আরেকটি সত্যি মাথায় রাখা দরকার। আলেম সমাজের বিরুদ্ধেও অভিযোগ কম নেই—আধুনিক প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা, মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালনায় দুর্বলতা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় সমাজের নিজস্ব চারিত্রিক সমস্যাও মানুষকে চ্যাটবটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ শুধু প্রযুক্তির হাতছানিতে নয়, কোথাও কোথাও বিকল্পের অভাবেও এআইয়ের শরণাপন্ন হচ্ছে।

তাহলে এখন উপায় কী

মিসরীয় ধর্মীয় স্কলাররা এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। সরকারি ফতোয়া সংস্থা দার আল-ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ চলতি বছরের শুরুতে কোরআনের তাফসির ও ব্যাখ্যায় চ্যাটজিপিটির মতো এআই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের যুক্তি, এআইয়ের ব্যাখ্যায় গুরুতর পদ্ধতিগত ঘাটতি আছে—এটা মূল উৎস সম্পর্কে যথেষ্ট জানে না, কোনো বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান নেই, আর প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা-পদ্ধতিও অনুপস্থিত। বিভিন্ন ভাষা ও পরস্পরবিরোধী সূত্র থেকে তৈরি উত্তরে এমন উপাদানও মিশে যেতে পারে, যা বিকৃত বা অগ্রহণযোগ্য।

তাই তাদের পরামর্শ—কোরআন বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম ও প্রতিষ্ঠানের কাছেই যেতে হবে। তবে মজার বিষয় হলো, এই সংস্থাটি নিজেই ফতোয়াপ্রো নামের একটা অ্যাপ চালু রেখেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, যুক্তরাজ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়।

তবে সৌদি আরব আর কাতারের সরকারি ধর্মীয় সেবাগুলো স্কলারদের তত্ত্বাবধান বজায় রেখে এআই গ্রহণ করেছে। একদল স্কলার ও প্রযুক্তিবিদ মনে করছেন, প্রযুক্তি বর্জন না করে বরং তাকে ইসলামের নিজস্ব নৈতিক কাঠামোয় বশ মানানোই বুদ্ধিমানের কাজ—একে তাঁরা বলছেন ‘মুসলিম টেক স্ট্যাক’ গড়ে তোলা। এর জন্য নিজস্ব সার্ভার ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

নিখোঁজ সংবাদ: মাদ্রাসার শিশু–কিশোরের সংখ্যা কেন বেশি

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার নাহদলাতুল উলামা ও মুহাম্মাদিয়াহর মতো বৃহৎ ধর্মীয় সংগঠন এবং দোহার রিসার্চ সেন্টার ফর ইসলামিক লেজিসলেশন অ্যান্ড এথিকসের স্কলাররা যৌথভাবে কাজ করছেন একটি বৈশ্বিক নৈতিক এআই-নীতিমালা তৈরির জন্য, যা দাঁড় করানো হচ্ছে ‘মাকাসিদ আশ-শরিয়া’ বা ইসলামের উচ্চতর লক্ষ্যগুলোর ভিত্তিতে।দিন শেষে প্রযুক্তি একটা হাতিয়ার মাত্র। তাই প্রশ্নটা এখন আর এই নয় যে এআই ধর্মের জন্য ভালো না খারাপ।

আসল প্রশ্ন হলো—আমরা এই প্রযুক্তিকে কোন শর্তে, কার তত্ত্বাবধানে এবং ঠিক কত দূর পর্যন্ত আমাদের জীবনে জায়গা দিচ্ছি। কারণ, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও প্রকৌশলীরা ধর্মের ওপর নিজেদের কোনো দাবি জানাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু আড়ালে থেকে তারা মানুষের ধর্মীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করার ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে। সেই ক্ষমতাটা কার হাতে যাচ্ছে, আর কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে, ধর্ম ও প্রযুক্তির এই নতুন সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়াবে।

মনযূরুল হক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

ই–মেইল: [email protected]

মতামত লেখকের নিজস্ব