জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘দেশের মানুষ বারবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে; কিন্তু বারবার বাধা পেয়েছে। যে সুযোগ এসেছে, সেই সুযোগ যেন আমরা কখনো অবহেলায় না হারাই।’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশন প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সিলেট সিটি করপোরেশন এ সংবর্ধনার আয়োজন করে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রথম সিলেট সফর করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ঢাকার বাইরে ৬ সেপ্টেম্বর তিনি নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও প্রথম সফর করেন। এরপর সিলেটে সফর করলেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করি, সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। প্রধান দায়িত্ব হবে, যে সংসদ আছে সেই সংসদকে ফাংশনাল (কার্যকর) করা। দ্বিমত থাকতে পারে; সেই দ্বিমতগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কিন্তু সমাধান করা সম্ভব।’
বাংলাদেশে হয়ে যাওয়া গত সংসদ নির্বাচনটি আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এখানে সরকার গঠন হয়েছে। ওই সরকার চেষ্টা করছে অতি দ্রুততার সঙ্গে কী করে, সেই একটা ভগ্নস্তূপ থেকে আবার দেশকে জাগিয়ে তোলা যায়।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি প্রায়ই আপনাদের বলতাম, আমরা যাঁরা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করি, তাঁরা অনেকটা ফিনিক্স পাখির মতো। ধ্বংস হয়ে যায়, সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। গণতন্ত্র পেয়েছি, গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অতীতে লড়াই করেছি গণতন্ত্রের জন্য। সামনের লড়াই হচ্ছে আমাদের দেশকে পুনর্গঠন করার জন্য। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটা বাসযোগ্য আবাসস্থল যেন আমরা নির্মাণ করতে পারি—এ বিষয়গুলো আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সিলেটের কিছু সমস্যার কথা আপনারা বলেছেন। আমার মনে হয় আপনাদের মন্ত্রীবর্গ যাঁরা আছেন, আপনাদের সংসদ সদস্য যাঁরা আছেন; তাঁরা যথেষ্ট যোগ্য। এ বিষয়গুলো নিয়ে তাঁরা কথা বলছেন, কাজ শুরু হয়েছে।’
‘বাংলাদেশের সৌন্দর্য কমিউনাল হারমনি’
কমিউনাল হারমনি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—আমরা এখানে অনেকগুলো জাতি একসঙ্গে বাস করি। বাংলাদেশের সবচেয়ে সৌন্দর্য হচ্ছে, বাংলাদেশে এত কমিউনাল হারমনি আছে, এটা আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই।’
এ সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমার বারবার করে মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে এখানে সমাবেশ করেছি, লংমার্চ করেছি। দীর্ঘকাল লড়াই করে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এখন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছি।’
অভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যদি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে না পারি, যদি নিজেরা নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে তা করে দিয়ে যাবে না। সে জন্যই বারবার বলছি, আসুন অন্তত আমাদের কমন (অভিন্ন) যে ইস্যুগুলো আছে, সেই ইস্যুগুলোতে একমত হই। একমত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। এখানে বিরোধী দল থাকবে, সরকারি দল থাকবে; সবকিছু নিয়ে এগোতে হবে।’
এ সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি ঠিক আগে যেভাবে কথা বলতাম আপনাদের সঙ্গে একজন রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে, কর্মী হিসেবে; এখন তো সেভাবে কথা বলতে পারি না। কারণ, আমি শপথ নিয়েছি যে আমি সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে কাজ করব, কথা বলব। কাজটি কঠিন হলেও আমি করার চেষ্টা করব। দলমত–নির্বিশেষে এবং বর্ণ–গোষ্ঠী—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা হবে আমাদের মূল কাজ।’

সমৃদ্ধ জনপদ সিলেট
নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সিলেট আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটা জায়গা। আমি যখনই সুযোগ পাই, সিলেটে আসি। আসি দুটো কারণে—একটা হচ্ছে আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় দুজন আউলিয়া এখানে আছেন, তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে আর আপনাদের সান্নিধ্য পেতে।’
এ সময় সিলেটকে সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘এই সিলেট নিজেই অত্যন্ত গর্বিত একটি জায়গা। কারণ, এখানে যাঁদের জন্ম হয়েছে, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরা আপনাদের গর্বিত সন্তান।’
সিলেটের সাহিত্য–সংস্কৃতি, চা-বাগানসহ নানা ঐতিহ্যের বিষয়েও কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘গতকালই পাকিস্তানের হাইকমিশনার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি বললেন যে কয়েক দিন আগে সিলেটে এসেছিলেন। চা এখান থেকে নিয়ে যাবেন, অর্থাৎ তাঁরা আমদানি করবেন। আমাদের এখান থেকে চা রপ্তানি হবে। এটা কো–অর্ডিনেট (সমন্বয়) করা দরকার।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। মঞ্চে রাষ্ট্রপতির স্ত্রী রাহাত আরা বেগম বসা থাকলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ।
সুধী সমাজের পক্ষে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কামাল আহমদ চৌধুরী, সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক আমিরুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি গোলাম ইয়াহিয়া চৌধুরী, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, দেবালয় রথযাত্রা কমিটির সভাপতি প্রশান্ত কুমার সিংহ প্রমুখ বক্তব্য দেন।
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উড়োজাহাজযোগে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। বিকেলে নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন। রাতেই তাঁর ঢাকায় ফেরার কথা।






