যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জরাজীর্ণ বাড়ি থেকে ১৬ শিশুকে উদ্ধার করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। গত চার বছরেরও বেশিরভাগ সময় ধরে তাদের ‘অত্যন্ত শোচনীয় পরিস্থিতিতে’ মাত্র একটি ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

উদ্ধার হওয়া শিশুরা সবাই একই পরিবারের সদস্য এবং তারা চারপাশে মানুষের মলমূত্র ও তীব্র নোংরা পরিবেশের মধ্যে বাস করছিল। এদের বয়স দেড় বছর থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ও তাদের মধ্যে ছেলে-মেয়ে উভয়ই রয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন কথাই বলতে পারে না। এমনকি ১৮ বছর বয়সী এক কিশোরী, যে মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, সে নিজের নামের বানান পর্যন্ত করতে পারছিল না।

ভিন্টন কাউন্টির শেরিফ রায়ান কেইন এক সংবাদ সম্মেলনে বাড়ির ভেতরের উচ্চ মাত্রার ব্যাকটেরিয়া ও মানুষের মলের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগ গবাদি পশুকেও এই শিশুদের চেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে রাখা হতো। এটি ছিল স্রেফ একটি জঘন্য ও বিরক্তিকর দৃশ্য।

ভিন্টন কাউন্টির প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নি উইলিয়াম আর্চার জানিয়েছেন, শিশুদের বাবা-মা এবং দাদা-দাদি (বা নানা-নানি)- এই চারজনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১৬টি করে দ্বিতীয় ডিগ্রির ফৌজদারি অপরাধের অধীনে ‘শিশু বিপন্ন করার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে ‘গুরুতর শারীরিক ক্ষতি’ জড়িত। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো মানব পাচারের ঘটনা নয় বরং এটি একটি ‘পারিবারিক অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি’।

ওহাইওর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যান্ডি উইলসন জানান, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি তদন্তের স্বার্থে তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ ঘটনাক্রমে এই শিশুদের সন্ধান পায়। উইলসন বলেন, আমরা জানতামই না যে সেখানে ১৬টি শিশু থাকবে। ওহাইওর অন্যতম দরিদ্র একটি কাউন্টিতে অবস্থিত হ্যামডেন নামের ছোট্ট একটি গ্রামের ওই বাড়িতে যা দেখেছেন, তাকে ‘পিওর ইভিল’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।

উইলসন বলেন, এই ‘ভয়াবহ’ দৃশ্য তার পুরো ক্যারিয়ারে দেখা সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ঘটনা। তিনি আরও যোগ করেন, এটি এমন একটি বিষয় যা আমরা আমাদের দেশে দেখতে অভ্যস্ত নই। ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরও তিনি এই বিষয়টি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

শেরিফ জানান, দেখে মনে হয়েছে শিশুরা তাদের বেশিরভাগ সময় আনুমানিক ১২ ফুট বাই ১২ ফুটের একটি ঘরের মধ্যে কাটিয়েছে। তাদের কীভাবে বাড়ির ভেতরে আটকে রাখা হতো তা তিনি প্রকাশ করেননি, তবে ঘরের ভেতর কোনো খাঁচা পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন।

উদ্ধার করা শিশুদের মধ্যে সাতজনকে কলম্বাসের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে ও দুজনকে হেলিকপ্টারে করে লেভেল-ওয়ান ট্রমা সেন্টারে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। উইলসন জানান, মঙ্গলবার (৩০ জুন) একটি শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল ও তাকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য ইনটুবেট করতে হয়েছিল। শিশুদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাদের দেখতে প্রায় বন্য পশুর মতো লাগছিল। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল।

বুধবার (১ জুলাই) গ্যারি সাইডার্স জুনিয়র, গ্যারি সাইডার্স সিনিয়র, ক্রিস্টিনা সাইডার্স এবং এলিজাবেথ সাইডার্স আদালতে হাজির হন। বিচারক তাদের পক্ষে ‘দোষী নন’ বলে আর্জি গ্রহণ করেন এবং প্রত্যেকের জামিন বাবদ ৩ লাখ ডলার নির্ধারণ করেন।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই পরিবারের সদস্যরা গত দুই দশক ধরে দক্ষিণ ওহাইওর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াত এবং তারা সুকৌশলে যেকোনো ধরণের চিকিৎসা ও সরকারি রেকর্ড তৈরি করা এড়িয়ে চলতো। শিশুদের কোনো স্কুলে ভর্তিও করা হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল উইলসন বলেন, তদন্তকারীদের চোখ থেকে দূরে ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে এই শিশুদের লুকিয়ে রাখতে তারা বেশ পারদর্শী ছিল। পরিবারের বাইরের কেউ এই শিশুদের সম্পর্কে জানত না বলেই মনে হচ্ছে।

হ্যামডেন গ্রামের জনসংখ্যা ১ হাজারেরও কম, যা কলম্বাস থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এই বাড়ির ভেতরে যে শিশুরা বাস করত, তা শুনে প্রতিবেশীরা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। ৬০ বছর বয়সী জোসেফ স্টুয়ার্ট অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, এই পরিবারটি আসার পর থেকে তিনি সেখানে ‘কোনো শিশুই দেখেননি’। তিনি গত ছয় বছর ধরে ওই রাস্তায় বসবাস করছেন এবং এলাকাটিকে একটি "শান্ত এলাকা" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেন।

প্রসিকিউটর আর্চার জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার বর্তমানে এই সমস্ত শিশুদের সাময়িক হেফাজত (টেম্পোরারি কাস্টডি) পাওয়ার চেষ্টা করছে। অ্যাটর্নি জেনারেল উইলসন দৃঢ়তার সাথে বলেন, "এই শিশুদের জন্য উপযুক্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এসএএইচ