পাবনা জেলা সদরের মালঞ্চি ইউনিয়নের বাসুদেবপুর কবরস্থান। পাশাপাশি ছয়টি নতুন কবর। দাফনের পর কেউ কেউ এসে জিয়ারত করছেন। কেউ আবার দাঁড়িয়ে একনজর দেখছেন। এর আগে কখনো ওই এলাকায় একসঙ্গে এত জনের দাফন হয়েছে কি না, তা স্মরণ করতে পারছেন না কেউ।
কবরস্থানের কাছে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা রুদ্র মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। একসঙ্গে ছয়জনের লাশ দাফন এই প্রথম দেখলাম।’
গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মালঞ্চি ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া গ্রামের সোনাপাতিল বিলে শখের বসে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে এই ছয়জনের মৃত্যু হয়। আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে ছয়জনকেই স্থানীয় বাসুদেবপুর কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।
মারা যাওয়া ছয়জন হলেন মালঞ্চি ইউনিয়নের গজমতিকুন্ডা গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে শাওন (২২), নলমুড়া গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে রুবেল হোসেন (২২), শাজাহান আলীর ছেলে মিজান হোসেন (১২), সুজন ইসলামের ছেলে সাজিদ ইসলাম (১০), শাহাদুল ইসলামের ছেলে মো. আবদুল্লাহ (১৮) ও ইবাদত প্রামানিকের ছেলে ইমন প্রামানিক (১৪)।
নিহত ছয়জনের মধ্যে মিজান, ইমন ও আবদুল্লাহ তিন চাচাতো ভাই। আর সাজিদ তাঁদের ফুফাতো ভাই।
‘ভাইগের সাথে মাছ ধরতি গেছিল’
বাসুদেবপুর কবরস্থান থেকে দুপুর ১২টার দিকে নলমুড়া গ্রামে ঢুকতেই দেখা যায় এক নারীকে ধরে রিকশাভ্যানে তোলার চেষ্টা করছেন আরও কয়েকজন নারী। কিন্তু বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। পড়ে যাচ্ছেন পাকা সড়কে। অনেক চেষ্টায় ওই নারীকে রিকশাভ্যানে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন অন্য নারীরা। মূর্ছা যাওয়া এই নারী ইমন প্রামানিকের মা রেহেনা খাতুন।
—ইবাদত প্রামানিক, মারা যাওয়া ইমন প্রামানিকের বাবাবেটাডা আমার ক্লাস ফাইভে পড়ত, ছুটি পায়ে ভাইগের সাথে মাছ ধরতি গেছিল। এই পরিণতি হবি ভাবতিও পারিনি।প্রায় একই দৃশ্য দেখা যায় মারা যাওয়া রুবেল হোসেনের বাড়িতে। ভাইয়ের শোকে মাতম করছিলেন বোন ইয়াসমিন আক্তার। বলছিলেন, ‘এ কী হলো, আমার ভাই কই।’
রুবেল হোসেনের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর ভাই জেলা সদরের ইসলামিয়া কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ত। শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় শখ করেই বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিল। এর মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়। ফেরার পথেই বজ্রপাতে মারা যায় সে।

ছেলের এমন মৃত্যু কল্পনা করতে পারেননি ইমনের বাবা ইবাদত প্রামানিক। তিনি বলেন, ‘বেটাডা আমার ক্লাস ফাইভে পড়ত, ছুটি পায়ে ভাইগের সাথে মাছ ধরতি গেছিল। এই পরিণতি হবি ভাবতিও পারিনি।’
মিজান হোসেন একটি হোসিয়ারি কারখানায় কাজ করত। মা নাজমা আক্তার বলেন, ছেলে গত মাসেই চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছে। ছেলের বাবা অসুস্থ। ছেলের আয়েই সংসার চলত। এখন কী দিয়ে কী করবেন বুঝতে পরছেন না।
শখ করে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন আটজন, ছয়জনেরই মৃত্যুমালঞ্চি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির আহম্মেদ বলেন, মারা যাওয়া কেউই মৎস্যজীবী নন। সবাই শখের বশে মাছ ধরতে গিয়েছিল। এর মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় পুরো গ্রাম স্তব্ধ।
সন্তান হারানো এই পরিবারগুলো আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়। পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে রাতেই আমরা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। প্রতিটি পরিবারকে নিয়ম অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।’








