লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৩ জুন প্রথম আলোর ‘গোল্লাছুট’–এ । তখনো প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই এটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। লেখাটি আজ প্রথমবারের মতো ‘অন্য আলো’র অনলাইন পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
শৌনক সেদিন সমিত ভাইয়ার বলে এমন এক স্ট্রেইট ড্রাইভ করল যে বলটা উঁচু হয়ে উঠে সামনের বাড়ির জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল। আম্পায়ারের দুটো হাত উঠে গেল ওপরের দিকে। ছক্কা! এই ছয়ের সঙ্গে সঙ্গেই খেলা খতম! সমিতদের ৪২ রানের জবাবে শৌনকরা করে ফেলল দুই উইকেটে ৪৭। শৌনককে কাঁধে নিয়ে জয় ভাইয়ার সে কী লাফালাফি! উল্লাস কমলে শৌনক গেল সমিত ভাইয়ার কাছে। বলল, ভাইয়া, কেমন শট নিলাম? এবার আমাকে ফার্স্ট ইলেভেনে রাখবে তো?
শৌনক আশা করেছিল, দলের ক্যাপ্টেন সমিত ভাইয়া বলবে, অবশ্যই নেব। এখন থেকে তুই হবি আমাদের ওপেনার।
কিন্তু তা না করে সমিত ভাইয়া ঠাস করে এক বিরাশি শিক্কা ওজনের চড় বসিয়ে দিল শৌনকের গালে। লাল হয়ে গেল শৌনকের গাল। রক্তচোখে সমিত বলল, দূর হয়ে যা সামনে থেকে! টেন্ডুলকার এসেছেন!
বিস্ময়ে মুখ দিয়ে কথা বের হলো না শৌনকের। চোখ ফেটে পানি বের হতে চাইছে। ১০ বছর হয়ে গেছে ওর, এই বয়সে ও সবার সামনে কাঁদতে পারে না। তাই চোয়াল শক্ত করে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে এল শৌনক। ঘরে বসে পুরো ঘটনাটা আবার ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। সমিত ভাইয়ার বলে ছয় না মেরে কল্প ভাইয়ার বলে মারলে নিশ্চয়ই এ চড়টা খেতে হতো না ওর। এ কথা ভাবতেই আর কান্না ধরে রাখতে পারল না শৌনক। চোখের পানিতে বুক ভেসে গেল ওর। শৌনক কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, সেটা ও জানেই না। ঘুম ভাঙল বাবার ডাকে।
—কিরে এই অসময়ে ঘুমুচ্ছিস?
—ঘুম এসে গেল বাবা।
—চোখ ফোলা কেন, অসুখ করেছে?
—না বাবা।
—তাহলে কি কেউ ঠেঙিয়েছে?
জবাব দিল না শৌনক। শুধু চোয়াল শক্ত হয়ে গেল ওর।
বাবা বললেন, ফার্স্ট ইলেভেনে নেয়নি তোকে, তাই না? কুছ পরোয়া নেহি। তোর তো বয়স মাত্র ১০। ১২ বছর হলে দেখবি, সবাই তোর খেলাই দেখবে।

বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেছে। রাতে সবার চোখ টেলিভিশনের দিকে। কেমন খেলছে আর্জেন্টিনা? কেমন খেলছে ব্রাজিল? ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড পারবে তো? এ প্রশ্নগুলো আলোচিত হয় স্কুলে, পাড়ার মাঠে। এখন মাঠে কেউ ব্যাট-বল হাতে ক্রিকেট খেলতে যায় না। ফুটবলই একমাত্র খেলা। মাঠেও সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় পেলে আর ম্যারাডোনাকে নিয়ে। সমিত ভাইয়া পেলের ভক্ত। বলে, পেলে যখন খেলত, তখন ম্যারাডোনার জন্মই হয়নি। ম্যারাডোনাকে বলিস পেলের সঙ্গে খেলতে। পাত্তাই পাবে না। পেলের ভিডিও ফুটেজগুলো দেখেছিস? হেডগুলো দেখেছিস?
এবারও কোনো কথা বলে না শৌনক। শুধু চোখ সরু করে তাকায় বারান্দার দিকে। একটি সাদা-কালো ফুটবল সেখানে রাখা। একেবারে নতুন।
—বলটা কার বাবা?
—কিনলাম।
—কার জন্য?
—তোর জন্য। ক্রিকেটের পাশাপাশি তুই ফুটবলটাও শিখবি। শুনে রাখ। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন সারা দেশে ছিল ফুটবলের কদর। আমাদের দেশে প্লেয়ার ছিল কারা জানিস? পিন্টু, শান্টু, এনায়েত, সালাউদ্দিন... স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও ওরা খেলেছে।
বাবার কিছু কথা মাথায় ঢোকে শৌনকের, কিছু কথা ঢোকে না। ও এগিয়ে যায় ফুটবলের দিকে। তারপর বলটি বুকে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায়।
২.
একা একা প্র্যাকটিস করতে করতে একসময় স্কুলের ড্রিল টিচারের চোখে পড়ে যায় শৌনক। বলের ওপর কীভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, কীভাবে ড্রিবলিং করতে হবে, পাস দিতে হবে তা শিখিয়ে দেন তিনি। স্কুলের স্পোর্টসের দিন শৌনক প্রথম সবার নজরে এল। বল পায়ের ওপর নিয়ে ও প্রায় ৬ মিনিট রাখল। কখনো হেড করে, কখনো পায়ে, হাঁটুতে বল রেখে একবারও মাটিতে পড়তে না দিয়ে ৬ মিনিট পার করে দিল শৌনক। সারা মাঠ করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।
খেলা দেখানো শেষে ও যখন কাপড় বদলানোর জন্য যাচ্ছে ড্রেসিংরুমে, তখন পলিন এসে ফিসফিস করে বলল, আমাদের পেলে।
অন্যদিক থেকে দৌড়ে এল অনুরাধা। বলল, না, ও আমাদের ম্যারাডোনা...
৩.
বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেছে। রাতে সবার চোখ টেলিভিশনের দিকে। কেমন খেলছে আর্জেন্টিনা? কেমন খেলছে ব্রাজিল? ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড পারবে তো? এ প্রশ্নগুলো আলোচিত হয় স্কুলে, পাড়ার মাঠে। এখন মাঠে কেউ ব্যাট-বল হাতে ক্রিকেট খেলতে যায় না। ফুটবলই একমাত্র খেলা।
মাঠেও সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় পেলে আর ম্যারাডোনাকে নিয়ে।
সমিত ভাইয়া পেলের ভক্ত। বলে, পেলে যখন খেলত, তখন ম্যারাডোনার জন্মই হয়নি। ম্যারাডোনাকে বলিস পেলের সঙ্গে খেলতে। পাত্তাই পাবে না। পেলের ভিডিও ফুটেজগুলো দেখেছিস? হেডগুলো দেখেছিস?
জয় ভাইয়া প্রতিবাদ করে, ম্যারাডোনার ফুটেজ দেখিসনি? ছিয়াশিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কী গোলটাই না দিল ছয়জনকে কাটিয়ে। ওটা বিশ্বসেরা গোল।
সমিত ভাইয়া বলে, তার আগে যে হাত দিয়ে গোল দিয়ে বলল, ঈশ্বরের হাত, তার কী হবে?
ওদের তর্ক এরপর গড়ায় রোনালদো, মেসি, জিদান, ফিগো, বেকহাম পর্যন্ত। তারপর খেলা শুরু হয়। বেশির ভাগ খেলাই হয় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে। প্রতিদিনই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
শৌনক ছোট বলে একেকদিন একেক দলে খেলতে হয়। যেদিন ব্রাজিলের দলে, সেদিন ও নিজেকে পেলে ভাবতে থাকে আর যেদিন আর্জেন্টিনার পক্ষে, সেদিন ও হয়ে যায় তুখোড় ম্যারাডোনা।
সমিত ভাইয়া বলল, তুইই আমাদের ভরসা। ফাইনালে পেলের খেলাটা দেখিয়ে দিবি। আর শোন, ক্রিকেটে তুইই আমাদের ওপেনার। চড়ের জন্য স্যরি। জয় ভাইয়া বলল, তোর কাজ গোল করা, গোল করবি। ম্যারাডোনার খেলা ভুলে যাসনি তো! ওদের কোচও এসে বললেন, যখন সুযোগ পাবে, গোলে শট নেবে। ওদের ডিফেন্স ভেঙে চুরমার করে দেবে। শৌনক কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। চারদিকে দর্শকের চিত্কার ওকে স্পর্শ করছে না। ওর চোখে শুধু একটা গোল ফুটবল ছাড়া কিছুই নেই। মাঝেমধ্যে ঘোর ভেঙে দর্শকদের চিত্কার শোনা যাচ্ছে, পেলে-পেলে, ম্যারাডোনা-ম্যারাডোনা...
৪.
বিশ্বকাপের উত্তেজনায় ওদের পাড়াতেও আয়োজন করা হলো ফুটবল টুর্নামেন্ট। ৪ ফুট ৯ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতা যাদের তারাই খেলতে পারবে সে টুর্নামেন্ট। বিশ্বকাপের আদলে পিতল দিয়ে কাপটা বানানো হয়েছে। ঢাকা শহরের মোট ১২টা দল এই টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে। সমিত ভাইয়া, জয় ভাইয়ারা বাদ পড়ে গেছে। ওদের বয়স ১৩, উচ্চতা বেশি। পাড়ার দলের ভরসা এখন ১০ বছুরে শৌনক। ১২-১৩ বছরের ছেলেরাও খেলছে। আরও বড় কেউ কেউ দাড়িগোঁফ কামিয়ে কোমরে বেল্ট পরে বয়স আর উচ্চতা কমিয়ে খেলছে। কিন্তু শৌনকের সঙ্গে পেরে উঠছে না কেউ। প্রথম চার খেলায় সাত গোল দিল ও। এরপর ওদের খেলা হলেই মাঠ ভরে যায় দর্শকে। ছোট্ট একটা ছেলের খেলা দেখার জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে থাকে।
খেলা বেশ জমে উঠেছে। দিনে টুর্নামেন্ট। রাতে বিশ্বকাপ দেখা। দেখতে দেখতে বিশ্বকাপের ফাইনালের আগেই ওদের টুর্নামেন্টের ফাইনাল চলে এল। শৌনকরা ফাইনালে উঠেছে।
সমিত ভাইয়া বলল, তুইই আমাদের ভরসা। ফাইনালে পেলের খেলাটা দেখিয়ে দিবি। আর শোন, ক্রিকেটে তুইই আমাদের ওপেনার। চড়ের জন্য স্যরি।
জয় ভাইয়া বলল, তোর কাজ গোল করা, গোল করবি। ম্যারাডোনার খেলা ভুলে যাসনি তো!
ওদের কোচও এসে বললেন, যখন সুযোগ পাবে, গোলে শট নেবে। ওদের ডিফেন্স ভেঙে চুরমার করে দেবে।
শৌনক কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। চারদিকে দর্শকের চিত্কার ওকে স্পর্শ করছে না। ওর চোখে শুধু একটা গোল ফুটবল ছাড়া কিছুই নেই। মাঝেমধ্যে ঘোর ভেঙে দর্শকদের চিত্কার শোনা যাচ্ছে, পেলে-পেলে, ম্যারাডোনা-ম্যারাডোনা...
প্রথমে ওরা একটা গোল খেয়ে দমে গেল। মাঠের দর্শকদের মুখেও আর কোনো কথা নেই। পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল মাঠে। হাফটাইম পর্যন্ত পিছিয়ে থাকল ওরা ০-১ গোলে। সেকেন্ড হাফের ২০ মিনিট পর্যন্ত কোনো গোল নেই। তাহলে হেরে যাচ্ছে শৌনকের দল। দর্শকদের সারিতে জয় ভাইয়া আর সমিত ভাইয়াকে এক পলক দেখতে পেল শৌনক। দুজনের চোখেই পানি! অ্যা! বাচ্চাদের এই খেলা নিয়েও এত উত্তেজনা!
শৌনকের ঘোর তখনো কাটেনি। ও ঘোরের মধ্যে দেখতে পাচ্ছে, ওর একটা পা ম্যারাডোনার, অন্যটা পেলের। ওর গায়ে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি। সামনের কোনো এক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের হয়ে মাঠে নেমেছে ও। বাজছে জাতীয় সংগীত। তারপর খেলা শুরু হতেই বিশ্বের দ্রুততম গোলের ভেল্কি দেখাল শৌনক। সারা মাঠে শৌনকের প্রশস্তি। —কিরে, তোর চোখে পানি কেন, পেলে?—সমিত ভাইয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
২৫ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে উড়ে আসা একটি বলে ব্যাকভলি করল শৌনক। ও শটটা নিয়েই পড়ে গিয়েছিল। সারা মাঠে যেন বোমা ফাটল। গো-ল!
এর ঠিক ১০ মিনিট পর নিজেদের হাফ থেকে একটা বল পেল শৌনক। সেই বল নিয়ে আচমকা দিল দৌড়। কেউ বুঝতেই পারেনি, এত দূর থেকে কাউকে পাস না দিয়ে ও চলে যাবে প্রতিপক্ষ দলের গোলপোস্টের কাছে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার! দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপক্ষ দলের পাঁচজন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলকিপারের কাছে এসে হাজির হয়েছে শৌনক। গোলকিপার বেরিয়ে এসেছিল পোস্ট থেকে। শৌনক আলতো করে বলটি ওর মাথার ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিল জালে।
এরপর আবার ঘোরের মধ্যে চলে গেল ও।
খেলায় ২-১ গোলে জয় হলো ওদের।
সমিত ভাইয়া বলল, প্রথম গোলটা একেবারে পেলের মতো!
জয় ভাইয়া বলল, দ্বিতীয় গোলটা ম্যারাডোনার মতো!
শৌনকের ঘোর তখনো কাটেনি। ও ঘোরের মধ্যে দেখতে পাচ্ছে, ওর একটা পা ম্যারাডোনার, অন্যটা পেলের। ওর গায়ে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি। সামনের কোনো এক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের হয়ে মাঠে নেমেছে ও। বাজছে জাতীয় সংগীত। তারপর খেলা শুরু হতেই বিশ্বের দ্রুততম গোলের ভেল্কি দেখাল শৌনক। সারা মাঠে শৌনকের প্রশস্তি।
—কিরে, তোর চোখে পানি কেন, পেলে?—সমিত ভাইয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
ওর হয়ে উত্তর দেয় জয় ভাইয়া—ম্যারাডোনারা তো ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে যাবেই।








