চার বছর আগে সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মনিরুল ইসলাম। গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা সরকারি ভাতাও পান তিনি।
সরকারের দেওয়া বিনা সুদের ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা দিয়ে যে গাড়ি চলে, সেটার বদলে মনিরুল ব্যবহার করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি, যা জিপ নামে পরিচিত)। গাড়িটির চালক সরকারি। জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও মেটায় সরকার।
মনিরুল ইসলাম যে এসইউভি ব্যবহার করেন, সেটা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজ’ নামের একটি প্রকল্পের। এ রকম প্রকল্পের নামে গাড়ি কিনে তা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য দেয় এলজিইডি। এ তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের কিছু কর্মকর্তা।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ ও বগুড়া সিটি করপোরেশনও গাড়ি নিয়েছে এলজিইডি থেকে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এলজিইডির একটি গাড়ি ব্যবহার করে।
এ তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের কিছু কর্মকর্তা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তারা বলেছেন, এটা তাঁরা একা করেন না। যদিও নিয়ম বলছে, প্রকল্পের গাড়ি শুধু প্রকল্পেই ব্যবহার করতে হবে এবং প্রকল্প শেষে তা পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা এলজিইডি। পরিকল্পনা কমিশনে এলজিইডির প্রকল্প পাস করাতে হয়। দুদক দুর্নীতি দমনে কাজ করে। এসব সংস্থার কর্মকর্তারা যখন এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন, তখন পরস্পরকে সুবিধা ও সুরক্ষা দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এটা যোগসাজশমূলক অনিয়ম। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলজিইডি যেমন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে, তেমনি যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাঁরাও নিয়ম মানছেন না। তিনি বলেন, এলজিইডি বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও বেশি। এমন একটি সংস্থার কর্মকর্তারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য অন্য সংস্থাকে গাড়ি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন, এটা ভাবা অমূলক নয়।
অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তারা বলেছেন, এটা তাঁরা একা করেন না। যদিও নিয়ম বলছে, প্রকল্পের গাড়ি শুধু প্রকল্পেই ব্যবহার করতে হবে এবং প্রকল্প শেষে তা পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে।
কত গাড়ি
এলজিইডি গ্রামীণ অবকাঠামো, তথা রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার ইত্যাদি উন্নয়নে কাজ করে। পরিকল্পনা কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলজিইডির হাতে প্রকল্প রয়েছে ১১৯টি।
বাংলাদেশে প্রকল্পে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গাড়ি কেনা হয়। এলজিইডিও প্রকল্পে শত শত গাড়ি কিনেছে। তাদের কাছে প্রকল্পের কত গাড়ি আছে, তা জানা সম্ভব হয়নি। কর্মকর্তারা কিছুতেই সে তথ্য দিতে রাজি নন। তবে ২৬১টি গাড়ির একটি তালিকা পাওয়া গেছে। সে তালিকায় কারা এসব গাড়ি ব্যবহারের করেন, তা উল্লেখ রয়েছে।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি এসইউভি, ৪১টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৯টি কার।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এটা যোগসাজশমূলক অনিয়ম। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলজিইডি যেমন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে, তেমনি যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাঁরাও নিয়ম মানছেন না।৫৯ গাড়ি অন্যদের দিয়েছে এলজিইডি

প্রথম আলোর কাছে আসা তালিকায় দেখা যায়, ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি এলজিইডির কর্মকর্তারা চালান। তাদের অনেকেই গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারভুক্ত নন। ৫৯টি গাড়ি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে দিয়েছে এলজিইডি।
সবচেয়ে বেশি ২৬টি গাড়ি রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে রয়েছে আরও ৮টি। মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগ মিলিয়ে সংখ্যাটি ৩৪।
পরিকল্পনা কমিশনে ১০টি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬টি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৩টি, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৩টি, বগুড়া সিটি করপোরেশনে ২টি এবং দুদকে একটি গাড়ি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি গাড়ি পরিবহন পুলে ‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, তাঁদের দপ্তর ও নিরাপত্তার জন্য গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি গাড়ির ব্যবহারকারী হিসেবে প্রসিকিউটর লেখা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রসিকিউটররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। নিরাপত্তার জন্য তাঁদের গাড়িতে চলাচল প্রয়োজন। এ কারণে সরকারি সংস্থার কাছ থেকে গাড়ি আনা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারকারীদের তালিকায় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ক্ষেত্রেও সদস্য, বিভাগীয় প্রধান, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে এলজিইডির গাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি গাড়ি পরিবহন পুলে ‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, তাঁদের দপ্তর ও নিরাপত্তার জন্য গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি গাড়ির ব্যবহারকারী হিসেবে প্রসিকিউটর লেখা হয়েছে।
এলজিইডির যেসব গাড়ি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থায় দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কীভাবে দেওয়া হয়েছে, চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বছরে কত টাকা খরচ হচ্ছে এবং গাড়িগুলো ফেরত আনার কোনো উদ্যোগ আছে কি না—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পনা কমিশন ও দুদকে গাড়ি দেওয়া হয়েছে কি না, সেটা তিনি বলতে পারছেন না। তবে মন্ত্রণালয়ে তাঁদের কাজের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন।
প্রকল্পের গাড়ি প্রকল্পের বাইরের কেউ ব্যবহার করতে পারেন কি না, জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর বেলাল হোসেন দেননি। তিনি বলেন, কাজের প্রয়োজনে যখন যেখানে দরকার সেখানে এলজিইডির গাড়ি দেওয়া হয়েছে।
গাড়ি নিয়ে এই অনিয়ম নতুন নয়। সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তিনটি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তখন তিনি সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, একটি গাড়ি তিনি ব্যবহার করেন এবং একটি তাঁর পরিবার ব্যবহার করে। একটি থাকে বিকল্প হিসেবে। তিনি বলেন, তাঁর আগের সচিবও তিনটি গাড়িই ব্যবহার করতেন।
হেলালুদ্দীন এখন কারাগারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেই সেটা বৈধ হয় না।
স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারকারীদের তালিকায় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ক্ষেত্রেও সদস্য, বিভাগীয় প্রধান, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে এলজিইডির গাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই গাড়ি ব্যবহার

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ৩৫ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা সরকারের বিনা সুদের ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং মাসে মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাতা নেন; তবে এলজিইডির গাড়িও ব্যবহার করেন।
‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের জন্য বিনা সুদে গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়া শুরু করে সরকার। তখন বলা হয়েছিল, সরকারি গাড়ির প্রাধিকার পাওয়া কর্মকর্তাদের পরিবহন পুল থেকে গাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিকল্প হিসেবেই সুদমুক্ত ঋণ ও ভাতা–সুবিধা চালু করা হয়।
তখন এ বিষয়ে একটি নীতিমালা জারি করে বলা হয়, কর্মকর্তারা বিনা সুদে ঋণ পাবেন ৩০ লাখ টাকা। নেওয়া হবে শুধু ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জ। ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কোনো কর্মকর্তা যদি আট বছর ১০ শতাংশ হারে অবচয় সুবিধা (ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি) পান, তাহলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয় ১৩ লাখ টাকার মতো। এতে মাসে কিস্তি আসে ১১ হাজার টাকার আশপাশে।
অন্যদিকে সরকার গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়। ব্যবহারকারীরা বলছেন, ঢাকায় চলাচল করলে একজন কর্মকর্তার গাড়ি ঋণের কিস্তি, চালকের বেতন ও জ্বালানি খরচ হয়ে যায় সরকারের দেওয়া রক্ষণাবেক্ষণের অর্থে। অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে কর্মকর্তাদের মাসিক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ–সুবিধা ৫০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে বলেছিল। তবে কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে ১৬ জুলাই উদ্যোগটি বাতিল হয়।
প্রথম আলোর হাতে থাকা গত ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাবে, বিনা সুদের গাড়িঋণ নিয়েছেন ২ হাজার ৩৫৭ জন কর্মকর্তা। গত ২ এপ্রিল বিএনপি সরকার গাড়িঋণ দেওয়া স্থগিত করে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ৩৫ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা সরকারের বিনা সুদের ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং মাসে মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাতা নেন; তবে এলজিইডির গাড়িও ব্যবহার করেন।
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নেননি
এলজিইডি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের নতুন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আবদুল মঈন খানকে একটি গাড়ি দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি। তবে মঈন খান তা নেননি। তিনি সরকারের পরিবহন পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন। স্থানীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি নেননি।
অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মো. তাসনিমুজ্জামান ও সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) তৌহিদুল ইসলাম এলজিইডির গাড়ি নিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসান, সচিবের একান্ত সচিব জিসান বিন মাজেদ, অতিরিক্ত সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার, খলিলুর রহমান, আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ ও কাজী আনোয়ার ইমাম, উপসচিব সুলতানা আক্তার, আশফিকুন নাহার, তৌকির হোসাইন, হেলেনা পারভিন, রবিউল ইসলাম (পরে যুগ্ম সচিব হয়েছেন), আরিফুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী সহকারী সচিব জেসমিন প্রধান ব্যবহার করেন এলজিইডির গাড়ি।
এলজিইডি সূত্র বলছে, ৫৯টি গাড়ির সব কটিই প্রকল্পের। এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।
বিনা সুদে গাড়ি নেওয়ার পর আরেকটি গাড়ি কেন ব্যবহার করতে হচ্ছে—এমন প্রশ্নে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগ নয়, অন্যরাও (মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা) গাড়ি ব্যবহার করেন। তাঁকে যে গাড়ি দেওয়া হয়েছে, সেটা ফিক্সড (নির্ধারিত) নয়। মাঝেমধ্যে ব্যবহার করেন। বিনা সুদে যে গাড়ি নিয়েছেন, সেটি তিনি নিজে মাঝেমধ্যে ব্যবহার করেন, পরিবারের সদস্যরাও ব্যবহার করেন।
এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খানও। তিনিও বিনা সুদে সরকারি ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন, মাসে মাসে রক্ষণাবেক্ষণ ভাতাও নিচ্ছেন। একই সঙ্গে দুটি গাড়ি ব্যবহার প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
এলজিইডি সূত্র বলছে, ৫৯টি গাড়ির সব কটিই প্রকল্পের। এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।
পরিকল্পনা কমিশনে ১০ গাড়ি
সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের কাজ হলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যেসব প্রকল্প নেয়, সেগুলো পর্যালোচনা করা এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া করা। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প আটকে দিতে পারে। প্রকল্প পাস করাতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সেই পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের ১০টি গাড়ি দিয়েছে এলজিইডি। এর মধ্যে ৯টি গাড়ি ৯ জন কর্মকর্তা চালান। একটি থাকে ‘স্ট্যান্ডবাই’, অর্থাৎ যখন যার প্রয়োজন হয়, তিনি ব্যবহার করেন।
এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করা পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা হলেন কমিশনের সদস্য নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া ও মাহমুদুল হোসাইন খান, বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ, বাবুল মিঞা ও মো. আশরাফুজ্জামান, যুগ্ম সচিব মোছা. আনার কলি এবং উপপ্রধান শাহ মো. হেলাল উদ্দিন।
পরিকল্পনা কমিশনের বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ ব্যবহার করেন ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৩৫৭১ নম্বর গাড়ি। অন্য একটি সংস্থার গাড়ি অফিসে যাতায়াত বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার কতটা যৌক্তিক—৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে এমন প্রশ্নে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রজেক্ট দেখি, প্রজেক্টের কাজের জন্য নিয়ে যাই, এটা প্রজেক্টের কাজেই ব্যবহার করি।’
পরিকল্পনা কমিশন যেহেতু বিভিন্ন সংস্থার প্রকল্প যাচাই ও তদারকি করে, সেই সংস্থারই গাড়ি ব্যবহার স্বার্থের সংঘাত কি না, জানতে চাইলে কবির আহামদ বলেন, ‘আমরা শুধু প্রোজেক্টে যাওয়ার জন্য গাড়ি ব্যবহার করি।’
সেই পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের ১০টি গাড়ি দিয়েছে এলজিইডি। এর মধ্যে ৯টি গাড়ি ৯ জন কর্মকর্তা চালান। একটি থাকে ‘স্ট্যান্ডবাই’, অর্থাৎ যখন যার প্রয়োজন হয়, তিনি ব্যবহার করেন।
এই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পর পরিকল্পনা কমিশনের পার্কিং এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কমিশনের ভেতরে ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৩৫৭১ নম্বর গাড়িটি রাখা। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই গাড়িতেই কবির আহামদ নিয়মিত অফিসে আসা-যাওয়া করেন।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান মো. বাবুল মিঞাও এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। তাঁর কার্যালয় কমিশনের ১৭ নম্বর ভবনে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার আগে ভবনের সামনেই ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-২৮০১ নম্বর এলজিইডির গাড়িটি পার্ক করা দেখা যায়।
জানতে চাইলে বাবুল মিঞা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা অফিশিয়াল কাজে ব্যবহার করা হয়। অফিশিয়াল কাজের বাইরে ব্যবহার করা হয় না।’ প্রকল্পের গাড়ি এভাবে ব্যবহার করা যায় কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি একা তো ব্যবহার করছি না।’
প্রকল্প যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাই যখন সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করেন, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—এ কথা তুলতেই বাবুল মিঞা বলেন, ‘আমি যদি এসে এই ব্যবস্থা চালু করতাম, তাহলে আমাকে বলতে পারতেন। আমি তো এটা চালু করিনি।’
সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার পরও অন্য সংস্থার গাড়ি ব্যবহার করা উচিত কি না—জানতে চাইলে বাবুল মিঞা বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে তো বলতে পারেন না। এর চেয়ে বড় বড় অকাম–কুমাম আছে সেগুলো নিয়ে লেখেন।’
এলজিইডি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণের কাজও করে থাকে। মন্ত্রণালয়টিতে তিনটি গাড়ি ছিল, যা সম্প্রতি ফেরত দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান মো. বাবুল মিঞাএটা অফিশিয়াল কাজে ব্যবহার করা হয়। অফিশিয়াল কাজের বাইরে ব্যবহার করা হয় না।গাড়ি ফেরত আসে না
প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে এবং তা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক দফা চিঠি দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও চিঠি দিয়েছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা-২০২০-এর আওতায় গাড়ির ঋণ নেওয়া হয়েছে। গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাবদ পুরো অর্থ (৫০ হাজার টাকা) নিচ্ছেন। আবার বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহার করছেন। ফলে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অপচয়ের কারণ ঘটছে।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে একাধিক গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।
বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদাররাজনৈতিক সরকার শক্ত অবস্থান নিলেই কেবল এ অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।নিয়ম হলো, প্রকল্প শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে সচল গাড়ি সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দিতে হয়। গত পাঁচ বছরে শেষ হওয়া এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পের কটি গাড়ি পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে গত চার বছরে মাত্র ১৮টি গাড়ি জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকল্পের গাড়ি জমা না দিয়ে ব্যবহার করার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব এবং বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক সরকার শক্ত অবস্থান নিলেই কেবল এ অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।




