ভোলার কথা উঠলে সবার আগে মনে আসে ইলিশের নাম। নদী আর সাগরের সঙ্গে মিশে থাকা এই দ্বীপ জেলা যেন মাছের রাজ্য। মেঘনার ঢেউ, তেতুলিয়ার স্রোত আর বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশির সঙ্গে এখানে মানুষের জীবনও জড়িয়ে আছে গভীরভাবে। সেই জীবনযাত্রার এক ব্যস্ত, কর্মচঞ্চল এবং ভিন্নরকম অধ্যায়ের নাম—সামরাজ মাছঘাট।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণে মাদ্রাজ এলাকায় অবস্থিত এই বিশাল মাছঘাট দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। জেলায় ৭৪টি মাছঘাট বা মাছ আহরণকেন্দ্র আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরাজ মাছঘাট। বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় সমুদ্র থেকে মাছ ধরে জেলেরা খুব অল্প সময়েই এখানে পৌঁছে যেতে পারেন। প্রতিদিন শত শত ট্রলার সমুদ্র থেকে ধরে আনা তাজা মাছ এই ঘাটে নামায়। সূর্য ওঠার আগ থেকেই শুরু হয় ব্যস্ততা, আর সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা যেন এক জীবন্ত কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়। সমুদ্রে মাছ ধরা চলমান থাকাকালে প্রতিদিন এখানে গড়ে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ভোলার উপকূলীয় দুর্গম চরাঞ্চলে যখন প্রথম জনবসতি শুরু হয়; তখন ভারতের মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) থেকে কিছু শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিল। যার ফলে ঘাটের মূল ইউনিয়নটির নাম হয় ‘মাদ্রাজ ইউনিয়ন’। তবে তখন ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয় (যেমন মসজিদ বা মঠ) নির্মাণের জন্য দক্ষ কারিগরের অভাব ছিল। ঠিক তখন ‘শামরাজ’ নামে অত্যন্ত দক্ষ ও প্রভাবশালী রাজমিস্ত্রি প্রথম এই চরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

সেই সময় চরের মানুষের কাছে তিনি এতটাই পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন যে, তাঁর মৃত্যুর পর বা তাঁর কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে পুরো এলাকা এবং সংলগ্ন নদীঘাটটি ‘শামরাজের ঘাট’ নামে ডাকা শুরু হয়। কালক্রমে মুখের ভাষার বিবর্তনে ‘শামরাজ’ শব্দটি ‘সামরাজ’-এ রূপান্তরিত হয়। আজ সেই নাম শুধু একটি এলাকার পরিচয় নয় বরং উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার বিশাল কেন্দ্রবিন্দু।

আরও পড়ুন

কাপ্তাই লেকের মনোরম দৃশ্য দেখতে চাইলে

জানা গেছে, শুরুতে ঘাটটি সাধারণ মানুষের পারাপার ও ছোটখাটো মাছ বিক্রির স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে আশির দশকে চরফ্যাশন উপজেলা হিসেবে মানোন্নীত হওয়ার পর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। ফলস্বরূপ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা ট্রলার নিয়ে এখানে আসতে শুরু করেন এবং এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছের পাইকারি আড়ত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

fish

ঘাটে প্রবেশ করলেই প্রথমে চোখে পড়ে একের পর এক মাছভর্তি ট্রলার। কোথাও জেলেরা মাথায় করে ঝুড়ি নিয়ে মাছ নামাচ্ছেন, কোথাও আবার চলছে দরদাম। আড়তদারদের হাঁকডাক, শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণা আর বরফ ভাঙার শব্দ মিলিয়ে সৃষ্টি হয় অন্যরকম পরিবেশ। এখানে যে কোনো ধরনের তাজা মাছ পাওয়া যায়—ইলিশ, রূপচাঁদা, কোরাল, লইট্টা, চিংড়ি, পোয়া থেকে শুরু করে সাগরের নানা প্রজাতির মাছ।

মাছকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল অর্থনৈতিক বলয়। মাছের আড়ত, বরফকল, তেলের দোকান, জালের দোকান, ট্রলার নির্মাণ ও মেরামতের সরঞ্জামের দোকান—সব মিলিয়ে এটি যেন মাছনির্ভর স্বয়ংসম্পূর্ণ বাজার। মাছ ধরতে যাওয়া থেকে শুরু করে মাছ বিক্রি পর্যন্ত যা যা প্রয়োজন, তার প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায় এ এলাকায়।

সামরাজ ঘাটে আছে অসংখ্য মাছ কেনার আড়ত ও গদি। আড়তদাররা জেলেদের অনেক সময় আগাম অর্থ বা দাদন দিয়ে রাখেন, যাতে জেলেরা সমুদ্র থেকে ফিরে তাদের কাছেই মাছ বিক্রি করেন। প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ টাকার মাছের লেনদেন হয়। শুধু স্থানীয় বাজার নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এখান থেকে মাছ পাঠানো হয়।

আরও পড়ুন

শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে বাতাসের গানে একদিন

চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ভোলা জেলায় উৎপাদিত মোট মাছের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কেনাবেচা হয় এই সামরাজ ঘাটে। হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ মাছঘাটকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

তবে সামরাজ শুধু একটি মাছঘাট নয়; এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতা। এখানে এলে দেখা যায়, মাছের সঙ্গে মানুষের জীবনের কত গভীর সম্পর্ক। সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফিরে আসা জেলেদের মুখে ক্লান্তি যেমন আছে; তেমনই আছে জীবিকার নিশ্চয়তা খুঁজে পাওয়ার তৃপ্তিও।

fish

ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য সামরাজ হতে পারে ভিন্ন অভিজ্ঞতার জায়গা। যারা প্রকৃতি, মানুষ আর জীবনের বাস্তব গল্প খুঁজে বেড়ান, তাদের জন্য এটি হতে পারে অনন্য গন্তব্য। এখানে নেই বিলাসি পর্যটনকেন্দ্রের চাকচিক্য; আছে কর্মব্যস্ত মানুষের ঘাম, মাছের গন্ধমাখা বাতাস আর সমুদ্রনির্ভর জীবনযুদ্ধের অনন্য গল্প।

সামরাজ মাছঘাট শুধুই মাছের বাজার নয়, এটি উপকূলের স্পন্দিত জীবনচিত্র—যেখানে প্রতিদিন সমুদ্রের বুক থেকে উঠে আসে জীবিকা, স্বপ্ন আর হাজারো মানুষের গল্প।

আরও পড়ুন

পায়রার জল, জনপদ আর জীবন দেখতে চাইলে

যাতায়াত

ঢাকা থেকে ভোলা যাওয়ার জন্য নৌপথই ব্যবহার করা সহজ। সদরঘাট থেকে প্রতিদিন ভোলাগামী লঞ্চ চলাচল করে। এ ছাড়া সরাসরি চরফ্যাশনের বেতুয়াগামী লঞ্চেও যাওয়া যায়। বেতুয়া নেমে অটোরিকশায় করেই সামরাজ পৌঁছানো যায়। আবার ভোলা পৌঁছে সেখান থেকে স্থানীয় বাস, সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে করে চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটে পৌঁছানো যায়। ভোরবেলা গেলে মাছঘাটের প্রকৃত কর্মব্যস্ততা ও মাছ নামানোর দৃশ্য সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।

থাকা ও খাওয়া

সামরাজ এলাকায় উন্নত মানের পর্যটন হোটেল তুলনামূলক কম থাকলেও চরফ্যাশন উপজেলা সদর কিংবা ভোলা শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে। ভ্রমণকারীরা প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী সেখানে অবস্থান করতে পারেন।

খাবারের ক্ষেত্রে সামরাজ ও চরফ্যাশনের স্থানীয় হোটেলগুলোতে পাওয়া যায় নদী ও সাগরের তাজা মাছের নানা পদ। বিশেষ করে ইলিশ, চিংড়ি, কোরাল ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের স্বাদ ভ্রমণে বাড়তি আনন্দ যোগ করতে পারে। স্থানীয় রান্নার সহজ-সরল স্বাদ অনেকের কাছেই আলাদা আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

এসইউ