কামরুল হাসান হৃদয়

মিছিলে, সমাবেশে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কখনো কখনো একটি স্লোগান বারবার ফিরে আসে ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’। চারটি শব্দের এই স্লোগান কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অংশ। কারো কাছে এটি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, কারো কাছে নাগরিক অধিকারের দাবি, আবার কারো কাছে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে আলোচনায় আসা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলনেও স্লোগানটি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ইতিহাস বলছে, এর যাত্রা আজকের নয়; বরং কয়েক দশকজুড়ে নানা প্রেক্ষাপট পেরিয়ে এটি বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে।

‘আজাদি’ শব্দের ইতিহাস

‘আজাদি’ শব্দটির উৎস ফারসি ভাষায়। পরে এটি উর্দু, হিন্দি, বাংলা ও উপমহাদেশের আরও কয়েকটি ভাষায় প্রচলিত হয়। শব্দটির অর্থ স্বাধীনতা বা মুক্তি। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ‘আজাদি’ শব্দটি রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। সে সময় এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির প্রতীক। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরও শব্দটির ব্যবহার থেমে থাকেনি; বরং বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে ‘আজাদি’ নতুন নতুন অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে।

‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ কোথা থেকে এলো?

‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ স্লোগানটি ঠিক কখন প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য নেই। গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এ স্লোগানের কোনো একক উদ্ভাবক বা নির্দিষ্ট জন্মতারিখ প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

আরও পড়ুন

সময়ের আগেই বিশ্বের যেসব দেশের রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন

কাশ্মীরে ব্যাপক পরিচিতি

১৯৮০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে কাশ্মীরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ‘হাম ক্যা চাহতে? আজাদি’ এবং ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে। এরপর থেকেই ‘আজাদি’ শব্দটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক আলোচনায় আরও বেশি ব্যবহৃত হতে থাকে। তবে কাশ্মীরে এই স্লোগানের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই এটিকে কোনো একক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে দেখেন না গবেষকেরা।

সামাজিক আন্দোলনে নতুন ব্যাখ্যা

১৯৯০ এর দশকে মানবাধিকারকর্মী ও নারীবাদী কর্মী কমলা ভাসিন তার বিভিন্ন কর্মসূচিতে ‘আজাদি’ স্লোগানকে নতুন মাত্রা দেন। নারী নির্যাতন, বৈষম্য ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ‘আজাদি’কে তিনি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। এরপর দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজপথ

২০১৬ সালে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) ঘিরে জাতীয় বিতর্কের পর ‘আজাদি’ স্লোগান আবারও আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময়ে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র আন্দোলনেও এটি ব্যবহৃত হয়।

আন্দোলনকারীদের একাংশের ভাষ্য ছিল, তারা রাষ্ট্র থেকে নয়; বরং ক্ষুধা, বৈষম্য, বেকারত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি ও সামাজিক অন্যায় থেকে ‘আজাদি’ চান। অন্যদিকে সমালোচকেরা স্লোগানটির ব্যবহারের বিরোধিতা করেন। ফলে বিষয়টি জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।

সিএএ-এনআরসি আন্দোলনে

২০১৯-২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) ঘিরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে আন্দোলন হয়, সেখানে ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ স্লোগানটি আবারও ব্যাপকভাবে শোনা যায়। দিল্লির শাহিনবাগ, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা এই স্লোগান ব্যবহার করেন।

সর্বশেষ ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে

২০২৬ সালে ভারতে আলোচনায় আসে ককরোচ জনতা পার্টি নামে পরিচিত একটি যুবনেতৃত্বাধীন আন্দোলন। পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, বেকারত্ব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলন পরে কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনাও করে।

আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি, মিছিল ও সমাবেশে ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ স্লোগান ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে গবেষকদের মতে, এই স্লোগান কেবল এই আন্দোলনের নয়; বরং এটি বহু দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আরও পড়ুন

জুলাই বাঙালিকে যেসব স্মৃতি মনে করায়

একটি স্লোগান, বহু প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো স্লোগানের অর্থ নির্ভর করে তার ব্যবহারের প্রেক্ষাপটের ওপর। একই স্লোগান ভিন্ন সময়ে ভিন্ন আন্দোলনে ভিন্ন বার্তা বহন করতে পারে। তাই ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’কে একটি নির্দিষ্ট দল, মতাদর্শ বা আন্দোলনের স্লোগান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

শেষ কথা

কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি উপমহাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক আন্দোলন এবং প্রতিবাদের ভাষারও একটি অংশ। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু করে কাশ্মীরের আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন, সিএএ-এনআরসি বিরোধী বিক্ষোভ এবং সাম্প্রতিক ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন-বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে স্লোগানটি নতুন অর্থ ও নতুন ব্যাখ্যা পেয়েছে।

ফলে এই স্লোগানের ইতিহাস কোনো এক ব্যক্তি, দল বা আন্দোলনের ইতিহাস নয়; বরং উপমহাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতারই একটি অংশ।

লেখক ও সংবাদকর্মী

কেএসকে