ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বড় একটি পরিবর্তনের পথে হাঁটছে হামাস। তারা ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ ভেঙে দিচ্ছে। বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব তুলে দিচ্ছে ‘গাজার প্রশাসনের জাতীয় কমিটি’র হাতে। এটি শুধুই প্রশাসনিক রদবদল নয়; এর ভেতরে আছে বড় কৌশলগত ভাবনা। এ সিদ্ধান্তকে যদি কেউ আত্মসমর্পণ বা পরাজয় মনে করেন, তাহলে তিনি বর্তমান ফিলিস্তিনি সংগ্রামের বাস্তবতা বুঝতে ভুল করবেন।
হামাস স্পষ্ট করেছে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানতে চায়। গাজার প্রশাসন পুরোপুরি নতুন কাঠামোর হাতে না যাওয়া পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ হঠাৎ তারা সব ছেড়ে দিচ্ছে না; বরং ধাপে ধাপে সরে যাচ্ছে।
এ সিদ্ধান্তের প্রথম লক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হামাস নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চায় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে। তারা শুধু একটি সরকার নয়; তারা একটি আন্দোলন। তাদের শিকড় ফিলিস্তিনি সমাজের ভেতরে অনেক গভীরে।
প্রায় ২০ বছর ধরে হামাস একসঙ্গে দুটি কঠিন কাজ করেছে। একদিকে সরকার চালিয়েছে, অন্যদিকে প্রতিরোধ চালিয়েছে। গাজা ছিল অবরুদ্ধ। বারবার যুদ্ধ হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তা, হাসপাতাল—জীবনের মৌলিক কাঠামো বারবার ধ্বংস হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই তাদের প্রশাসন চালাতে হয়েছে। এটি সহজ কাজ ছিল না।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আধুনিক ফিলিস্তিনি ইতিহাসে এর মতো ধ্বংস খুব কমই দেখা গেছে। তবু একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। দখলদার শক্তি তাদের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। তারা হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি।
এ অবস্থায় গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানো হামাসের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। এতে তাদের ওপর সরাসরি চাপ কমবে। প্রশাসনিক দায়ও কমবে। তারা নিজেদের সংগঠন নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারবে। শক্তি পুনর্গঠন করতে পারবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তাদের মূল লক্ষ্যে, অর্থাৎ ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
হামাস মন্ত্রণালয় ছাড়তে পারে। কমিটি ভেঙে দিতে পারে। প্রশাসনের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে। কিন্তু এই পদক্ষেপের অর্থ প্রতিরোধ ছেড়ে দেওয়া নয়। গাজা শাসন করা ছিল একটি সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামই তাদের মূল লক্ষ্য। সেটিই রয়ে গেছে সামনে।
দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো জাতীয় ঐক্য। বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনি রাজনীতি ভেঙে আছে। গাজা একদিকে, পশ্চিম তীর আরেক দিকে। অভ্যন্তরীণ বিভাজনও কম নয়। এই বিভক্ত অবস্থাই দখলদার শক্তির বড় সুবিধা। এ বাস্তবতা বদলানো জরুরি।
হামাস বলছে, গাজা তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি পুরো ফিলিস্তিনি জনগণের। তাই নতুন প্রশাসন এমন হতে হবে, যা সবার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এখানে একটি সতর্কবার্তাও আছে। নতুন প্রশাসন যেন বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণে না চলে যায়। যেন এটি কোনো বিদেশি প্রভাবের হাতিয়ার না হয়।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় আছে। ফিলিস্তিনি সমাজে যেসব রাজনৈতিক শক্তির বাস্তব ভিত্তি আছে, তাদের বাদ দেওয়া যাবে না। তাদের বাদ দিলে ঐক্য গড়া সম্ভব নয়। তাই একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা অধিকৃত অঞ্চল, শরণার্থীশিবির এবং প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলতে পারে।

তৃতীয় লক্ষ্য হলো প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। শাসন আর প্রতিরোধ এক জিনিস নয়। এ দুইয়ের কাজ আলাদা। একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন অনেক ধরনের ভূমিকা নিতে পারে। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। প্রশাসন চালাতে পারে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে পারে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও মেনে নিতে পারে। আবার সময় এলে প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়াতেও পারে; যদি সেখানে থাকা তাদের বড় লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করে।
বহু বছর ধরে ইসরায়েল একটি যুক্তি দিয়েছে। তারা বলেছে, গাজায় হামাস সরকারে থাকার কারণেই অবরোধ, সামরিক হামলা এবং সমষ্টিগত শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই যুক্তি কি এখনো টিকে থাকে?
কারণ, হামাস এখন প্রশাসন হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবু দেখা যাচ্ছে, দখলদার শক্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। তারা চায় না নতুন জাতীয় কমিটি ঠিকভাবে কাজ শুরু করুক। বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে প্রশাসনিক শূন্যতা থাকবে। আর সেই শূন্যতা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে।
এপস্টেইন থেকে গাজা: পশ্চিমা অভিজাতদের নৈতিক মুখোশএই জায়গাতেই বড় একটি বিরোধাভাস সামনে আসে। মনে হয়, লক্ষ্য শুধু হামাসকে সরকার থেকে সরানো ছিল না। আসল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করা।
হামাস এখন মধ্যস্থতাকারী ও গ্যারান্টর রাষ্ট্রগুলোর দিকেও তাকাচ্ছে। তারা চাইছে এই দেশগুলো চাপ সৃষ্টি করুক, যাতে চুক্তি বাস্তবায়ন হয়। নতুন প্রশাসন কাজ শুরু করতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে গাজায় জরুরি জনসেবা ধীরে ধীরে ফিরতে পারে। মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। যুদ্ধের ফলে তৈরি মানবিক বিপর্যয়ের মোকাবিলাও শুরু করা সম্ভব হবে।
এ সিদ্ধান্ত দখলদার শক্তির কথাবার্তাকেও পরীক্ষা করছে। যদি সত্যিই যুদ্ধের কারণ হয়ে থাকে হামাসের শাসন, তাহলে তাদের সরে দাঁড়ানোর পর পরিস্থিতি বদলানোর কথা। দখলদার সেনা সরে যাওয়ার কথা। সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা। পুনর্গঠন শুরু হওয়ার কথা। সামরিক হামলা বন্ধ হওয়ার কথা।
কিন্তু যদি তা না হয়, যদি নতুন নতুন শর্ত চাপানো হয়, তাহলে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তখন আর লুকিয়ে রাখা যাবে না। সমস্যা শুধু কে গাজা শাসন করছে, তা নয়। সমস্যা হলো একটি জনগোষ্ঠী, যারা মাথা নত করতে রাজি নয়। যারা উচ্ছেদ হতে চায় না। যারা বিলুপ্ত হতে চায় না।
হামাস মন্ত্রণালয় ছাড়তে পারে। কমিটি ভেঙে দিতে পারে। প্রশাসনের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে। কিন্তু এই পদক্ষেপের অর্থ প্রতিরোধ ছেড়ে দেওয়া নয়। গাজা শাসন করা ছিল একটি সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামই তাদের মূল লক্ষ্য। সেটিই রয়ে গেছে সামনে।
সাইয়িদ মারকোস তেনোরিও একজন ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। তিনি ব্রাজিল-ফিলিস্তিন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা এবং সহসভাপতি।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।








