দেশে ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি সেবায় অনলাইন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি। অনলাইনে আবেদন করার পরও কাগজপত্র জমা, স্বাক্ষর, অর্থ পরিশোধ কিংবা সনদ সংগ্রহের জন্য নাগরিককে সরকারি দপ্তরে যেতে হচ্ছে। ফলে ‘ই-সেবা’ চালু হলেও এর বড় একটি অংশে রয়ে গেছে পুরোনো পদ্ধতির সরাসরি যোগাযোগ ও কাগজপত্রের নির্ভরতা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীতে গতকাল সোমবার এক সেমিনারে ‘যুবসমাজ, নারী-পুরুষ (লিঙ্গ) ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
সেমিনারে সিপিডির রিসার্চ ফেলো তামিম আহমেদ এবং গবেষণা সহকারী সাবিনা শারমিন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, মোট ২ হাজার ৬১১ জনের ওপর জরিপ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৩৮২ জন যুব, ৯৫৭ জন নারী এবং আদিবাসী, চর, হাওর, বস্তিবাসী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের ২৯৭টি সরকারি অফিসকে সরবরাহপক্ষের জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নারীদের মাত্র ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং যুবদের ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ পুরো সরকারি সেবাপ্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। নারীদের ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং যুবদের ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশকে অনলাইনে আবেদন করার পরও কাগজপত্র জমা দিতে সরাসরি সরকারি দপ্তরে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মূলত সেবার কিছু ধাপ অনলাইনে এনেছে; পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করতে পারেনি।
এই সীমাবদ্ধতার পেছনে নাগরিকের ডিজিটাল সক্ষমতার ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে সিপিডি। ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী এবং ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ যুব ডিজিটাল দক্ষতার অভাবকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুর্বল ইন্টারনেট, স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের অভাবও বড় প্রতিবন্ধক। অথচ ডিজিটাল প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ নারীদের মধ্যে অত্যন্ত সীমিত মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। মাত্র ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী সরকারি ই-সেবায় ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়াকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করেন। ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী তথ্য ফাঁস বা হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা করেছেন। ৬১ শতাংশ নারী ই-সেবা ব্যবহারের পর অননুমোদিত কল বা বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এতে নাগরিকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
জবাবদিহির ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ নারী এবং ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ যুব কখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা, কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থার অভাব এবং অভিযোগের অগ্রগতি জানার সুযোগ না থাকায় সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি অফিসগুলোর প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও দুর্বল। স্থানীয় সরকার অফিসগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি মাত্র ২৪ দশমিক ১ শতাংশ। ইউনিয়ন কৃষি অফিসে গড়ে সচল কম্পিউটার মাত্র শূন্য দশমিক ১৫টি; ৪৪ শতাংশ কম্পিউটার অচল। ৯৭ শতাংশ ইউনিয়ন কৃষি অফিসে বিদ্যুৎ ব্যাকআপ এবং ৯৩ শতাংশে বিকল্প ইন্টারনেট সংযোগ নেই। অঞ্চলভেদেও বড় বৈষম্য রয়েছে—ইউনিয়ন পর্যায়ে ময়মনসিংহের প্রস্তুতি স্কোর ৫৭ দশমিক ৩ হলেও রংপুরের মাত্র ৮ দশমিক ৮।
সেমিনারে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুধু অনলাইন সেবার সংখ্যা বাড়ালেই ই-গভর্ন্যান্স কার্যকর হবে না; নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ডিজিটাল দক্ষতা, তথ্যের নিরাপত্তা, অভিযোগের প্রতিকার, স্থানীয় পর্যায়ের অবকাঠামো এবং নারী-যুব-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই ই-গভর্ন্যান্সকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা সম্ভব।
সিপিডির মতে, ই-গভর্ন্যান্সের সমস্যা শুধু প্রযুক্তির ঘাটতি নয়; এটি অবকাঠামো, দক্ষতা, নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তির সমন্বিত সংকট। তাই ই-গভর্ন্যান্স কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সিপিডি একাধিক সুপারিশ দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার শক্তিশালী করা, সরকারি ডেটাবেইস আন্তসংযুক্ত করা, একক আবেদন-স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং, সহজ অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা এবং ই-গভর্ন্যান্স পারফরম্যান্স ড্যাশবোর্ড চালুর সুপারিশ করেছে।








