যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের সরকারি ব্যয় এ পর্যন্ত ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির শুনানিতে তিনি এ তথ্য জানান। শুনানিতে হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের কাছে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের আবেদনও রয়েছে।

তবে হেগসেথের দেওয়া ব্যয়ের হিসাব অন্যান্য অনেক মূল্যায়নের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে যেসব হিসাবের মধ্যে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর যুদ্ধের পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাবও ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, মুডিজ অ্যানালিটিক্সের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডিক ডারবিনের প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘আজ পর্যন্ত আমাদের যে হিসাব রয়েছে, তা হলো ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার।’ তিনি আরও জানান, এই হিসাবের মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত চলমান কিছু সামরিক অভিযান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

সর্বশেষ এই হিসাব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মে মাসে প্রকাশিত ২৯ বিলিয়ন ডলারের আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেশি। হেগসেথের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ১৭ জুন থেকে হামলা বন্ধ রাখতে কার্যকর হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) গত সপ্তাহে ভেঙে পড়ে।

এর আগে, গত সোমবার টানা দশম রাতের মতো ইরানে মার্কিন হামলার আগে ট্রাম্প বলেন, আরও দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ইরানকে এর ‘মূল্য দিতে হবে।’ গত এক সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনা ও সেতুতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। পাশাপাশি খার্গ দ্বীপ দখলে স্থলবাহিনী পাঠানো এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভের গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক-সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় বোমা হামলারও হুমকি দিয়েছেন। এ পর্যন্ত হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব বজায় রাখতে ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থাপনা, যা চলমান সংঘাতে তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে, ইরান অঞ্চলজুড়ে মার্কিন স্বার্থ ও স্থাপনাগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে। সর্বশেষ দফার হামলায় কুয়েতের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এছাড়া বাহরাইন ও জর্ডানের আরও কয়েকটি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে।

শুনানির উদ্বোধনী বক্তব্যে হেগসেথ বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তার ফলে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণ এবং উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন গোলাবারুদের সরবরাহ দ্রুততর করতে অর্থায়ন প্রয়োজন। আমরা সলিড রকেট মোটর, জেডিডিএএম (জয়েন্ট ডাইরেক্ট অ্যাটাক মিউনিশন), হাইপারসনিক অস্ত্র এবং ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতার কথা বলছি।’

পেন্টাগনের প্রধান আরও বলেন, চলমান যুদ্ধের কারণে বাজেট সংকটও ঘনিয়ে আসছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের বাজেটের চাহিদা যদি দ্রুত পূরণ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সীমিত করতে হবে। আর হ্যাঁ, এর একটি অংশ বর্তমান বাজেট চক্র এবং সেটি কীভাবে এগোচ্ছে, তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।’

এদিকে, ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্যাটি মারে এই বিশাল বাজেট প্রস্তাবের সমালোচনা করেন। প্রস্তাবে ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, ক্যারিবীয় অঞ্চলে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে সামরিক টহলের জন্যও অর্থ বরাদ্দের আবেদন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাই আমি সরাসরি বলছি। সত্য হলো, আপনাদের এই বাজেটের অনুরোধের খুব একটা যৌক্তিকতা নেই।’