জাহেলিয়া যুগে আরব সমাজে কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না। অধিকাংশ মানুষ পশুপালন, বাণিজ্য কিংবা গোত্রীয় যুদ্ধ ও লুটতরাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। সুদ, প্রতারণা, মজুতদারি, শোষণ ও ধনবৈষম্য ছিল সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। এমন এক বৈষম্যপূর্ণ সমাজে মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও মানবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমের মর্যাদা এবং শোষণমুক্ত অর্থনীতি। ইসলামি অর্থনীতির বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো-
যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন
ইসলামে আল-গানিমাহ বলতে বৈধ যুদ্ধে অর্জিত সম্পদকে বোঝায়। মহানবী (সা.) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ব্যক্তিগত লুটের মাল হিসাবে নয়; বরং একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বণ্টনের ব্যবস্থা করেন। এর এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হতো এবং অবশিষ্ট অংশ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জেনে রাখ, তোমরা যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন কর, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল, রাসূলের নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরের জন্য নির্ধারিত।’ (সূরা আল-আনফাল : ৪১)।
জাকাত : দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর ব্যবস্থা
জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট হারে জাকাত আদায়ের মাধ্যমে দরিদ্র, অসহায় ও সমাজের নির্ধারিত শ্রেণির মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। জাকাত শুধু ইবাদত নয়; এটি সম্পদের পবিত্রতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর, জাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর।’ (সূরা আল-বাকারা : ৪৩)।
খারাজ : রাষ্ট্রীয় আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস
খারাজ হলো ইসলামি রাষ্ট্রে বিজিত কৃষিজমির ওপর ধার্যকৃত ভূমিকর। মহানবী (সা.) ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভূমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব জনকল্যাণে ব্যয় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়।
জিজিয়া : নিরাপত্তা ও নাগরিক সুরক্ষার বিনিময়ে কর
জিজিয়া ছিল ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী সক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের ওপর আরোপিত একটি কর, যার বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করত। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, দরিদ্র, সন্ন্যাসী ও অক্ষম ব্যক্তিরা এ কর থেকে অব্যাহতি পেতেন।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যতক্ষণ না তারা বশ্যতা স্বীকার করে স্বহস্তে জিজিয়া প্রদান করে।’ (সূরা আত-তাওবা : ২৯)।
আল-ফাই : জনকল্যাণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ
আল-ফাই বলতে যুদ্ধ ছাড়াই ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে আসা সম্পদকে বোঝায়। এ সম্পদ রাষ্ট্র পরিচালনা, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ইয়াতিম, মিসকিন এবং জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হতো। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সূরা আল-হাশর : ৭)। এ আয়াত ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক দর্শন সম্পদের কেন্দ্রীভবন রোধ এবং সুষম বণ্টনের স্পষ্ট ঘোষণা।
বায়তুলমাল : ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থভান্ডার
মহানবী (সা.) রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সংরক্ষণ ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের জন্য বায়তুলমাল প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে দরিদ্রদের সহায়তা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করা হতো। এটি ছিল ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি।
সুদমুক্ত অর্থনীতি : শোষণমুক্ত সমাজের ভিত্তি
জাহেলিয়া যুগে সুদের প্রচলন ছিল ব্যাপক। ইসলাম সুদকে চূড়ান্তভাবে হারাম ঘোষণা করে বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছে। কারণ সুদ ধনীদের আরও ধনী এবং দরিদ্রদের আরও অসহায় করে তোলে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সূরা আল-বাকারা : ২৭৫)।
সম্পদের ন্যায্য বণ্টন
ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদের সুষম বণ্টন। জাকাত, সদকা, ওয়াক্ফ, উত্তরাধিকার আইন এবং দান-সদকার মাধ্যমে ইসলাম এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যাতে সম্পদ কেবল ধনী শ্রেণির হাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সূরা আল-হাশর : ৭)।








