দেশের চিকিৎসা শিক্ষার ইতিহাসে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম দেশ-বিদেশে সমাদৃত এর মধ্যে অন্যতম শীর্ষে রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি)। চিকিৎসক তৈরির বিদ্যাপীঠ হিসেবে যেমন এর সুনাম রয়েছে তেমনি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসেও রয়েছে এর অনন্য অবদান।

১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ আমলে যাত্রা শুরু করা ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান এবার ৮০ বছর পূর্ণ করে পদার্পণ করছে ৮১তম বছরে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুরো ক্যাম্পাস এখন উৎসবের সাজে সেজেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হলেও একদিন পর অর্থাৎ ১১ জুলাই সাড়ম্বরে ‘ডিএমসি ডে’ উদযাপনের সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে।

আরও পড়ুন

শনিবার ঢাকা মেডিকেলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘২০ হোস্টেল প্রকল্প’-এর আওতায় দুটি ছাত্রী হোস্টেলের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, বৃক্ষরোপণ এবং আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশেষ মাত্রা যোগ করতে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জোবায়েদা রহমান।

সাজ সাজ রব: উৎসবের রঙে ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাস

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্ত তি। মূল ফটকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর লোগো সংবলিত সুদৃশ্য ব্যানার, তোরণ ও বর্ণিল সাজসজ্জা স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করছেন। বৃক্ষরোপণ এলাকার টব রং করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন স্থানে চোখধাঁধানো আলোকসজ্জার প্রস্তুতিও চলছে।

jagonews24প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি/ ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

ক্যাম্পাসের দেয়ালে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরা চিত্রকর্ম ও তথ্যফলকগুলো নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

আরও পড়ুন

ঢামেক হাসপাতালের দুই এমআরআই যন্ত্রই বিকল, ভোগান্তিতে রোগীরা

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কলেজ মিলনায়তনের সংস্কার, আসনের নতুন কভার লাগানো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ চলছে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ফগার মেশিনের সাহায্যে পুরো ক্যাম্পাসে জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে অস্থায়ী ব্যারিকেড স্থাপনসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। অনেকেই দীর্ঘদিন পর সহপাঠী, শিক্ষক ও সিনিয়র-জুনিয়রদের সঙ্গে পুনর্মিলনের এক মধুর মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছেন।

‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা মেডিকেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বহু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রিয় ক্যাম্পাসে আসছেন, যা অত্যন্ত আবেগঘন ও আনন্দের।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানেও এ প্রতিষ্ঠানের অবদান অবিস্মরণীয়।

jagonews24ঢামেকের ৮০ বছর উদযাপনের প্রস্তুতি/ ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা মেডিকেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বহু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রিয় ক্যাম্পাসে আসছেন, যা অত্যন্ত আবেগঘন ও আনন্দের।

আরও পড়ুন

ঢামেক হাসপাতালের সামনে ফুটপাত থেকে হকার সরিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন

কলেজের ৬৯তম ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ডা. সজীব বলেন, ঢাকা মেডিকেল আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন আমাদের জন্য বিশেষ আনন্দের। দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং আমাদের কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জোবায়েদা রহমানের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও অনেক বেশি স্মরণীয় ও গৌরবময় করে তুলবে।

আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী ডা. গোলাম সাকলাইন বলেন, এই ক্যাম্পাসে আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়—মেডিকেল লাইফ ও ইন্টার্নি কেটেছে। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি স্মৃতিচারণ, পুনর্মিলন এবং নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধনে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক পরম আশীর্বাদ।

’৫২ থেকে ’২৪: ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ঢামেক

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাস শুধু চিকিৎসা শিক্ষার নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

jagonews24ইতিহাসের দেয়ালে ঢামেকের গৌরবগাথা/ ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

’৫২-র ভাষা আন্দোলন ও প্রথম শহীদ মিনার: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের রক্তে প্রথম রঞ্জিত হয়েছিল এই ঢামেক প্রাঙ্গণই। আমতলার ঐতিহাসিক মোড় আর ঢামেক হোস্টেলের ব্যারাকগুলো পরিণত হয়েছিল আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে। গুলিবিদ্ধ রফিক, বরকত, জব্বারসহ ভাষাসৈনিকদের ঢামেকের জরুরি বিভাগেই আনা হয়েছিল এবং চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তারা এখানেই শহীদ হন। এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢামেকের শিক্ষার্থীরাই রাতের অন্ধকারে তৈরি করেছিলেন ইতিহাসের প্রথম ‘শহীদ মিনার’ যা বাঙালি জাতিসত্তার প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে।

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ‘৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা অনন্য ভূমিকা পালন করেন। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ নেন। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবে অধ্যাপক ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বীসহ বহু প্রথিতযশা চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী শহীদ হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত স্থাপনায় ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ। শুরুতে ছিল মাত্র চারটি বিভাগ—অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি ও মেডিসিন। প্রথম ব্যাচে ভর্তি হন ১০০ জন শিক্ষার্থী। প্রথম ব্যাচে কোনো ছাত্রী না থাকলেও দ্বিতীয় ব্যাচেই যুক্ত হন প্রথম নারী শিক্ষার্থী কে বি এম আকতার মহল।

পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএমএ-র তৎকালীন যৌথ মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলনের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেয়।

২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থান

সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানেও ঢামেক হাসপাতাল আহতদের চিকিৎসায় মূল ফিল্ড হাসপাতালে পরিণত হয়েছিল। টানা কয়েক দিন চিকিৎসক, ইন্টার্ন ও শিক্ষার্থীরা না ঘুমিয়ে নিরলসভাবে শত শত গুলিবিদ্ধ মানুষকে সেবা দিয়েছেন। হাসপাতালের ভেতরে বাইরে থেকে হামলার চেষ্টা হলে শিক্ষার্থীরা মানবঢাল তৈরি করে রোগীদের রক্ষা করেছিলেন। বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকদের এই বীরত্বগাথা ঢামেকের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

চার বিভাগ থেকে দেশের বৃহত্তম চিকিৎসাকেন্দ্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত স্থাপনায় ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ। শুরুতে ছিল মাত্র চারটি বিভাগ—অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি ও মেডিসিন। প্রথম ব্যাচে ভর্তি হন ১০০ জন শিক্ষার্থী। প্রথম ব্যাচে কোনো ছাত্রী না থাকলেও দ্বিতীয় ব্যাচেই যুক্ত হন প্রথম নারী শিক্ষার্থী কে বি এম আকতার মহল।

আট দশকের দীর্ঘ বিবর্তনের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান চালিকাশক্তি ও বৃহত্তম চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে।

jagonews24

 

আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন, জটিল নিউরোসার্জারি থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি—সব খাতেই ঢামেক আজ দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক।

ঐতিহ্যের আলোয় আগামীর প্রত্যাশা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হাসপাতাল নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের এক জীবন্ত দলিল। প্রতিদিন ধারণক্ষমতার বহুগুণ বেশি রোগীকে দিন-রাত চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়, তা পৃথিবীতে বিরল।

আরও পড়ুন

মানহীন আইসিইউ এখন মরণফাঁদ

৮১তম বছরে পদার্পণের এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনের দিনে শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একটাই প্রত্যাশা—ঐতিহ্যের এই গৌরব ধরে রেখে ঢামেককে যেন বিশ্বমানের একটি আধুনিক গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও ঢামেক যেভাবে গত ৮০ বছর ধরে বাঙালির পাশে থেকেছে, আগামীতেও সেই আদর্শই হোক এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল অঙ্গীকার।

আরও পড়ুন

নতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!

৮০ বছর পূর্ণ উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে এই অনুষ্ঠান অয়োজনের জন্য ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

এমইউ/এমআইএইচএস/