ইউক্রেনের জনগণ এক নারকীয় শীতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে থমকে গিয়ে রাশিয়া এখন প্রতিদিন সাধারণ মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল আর বেঁচে থাকার রসদগুলোর ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ জোরদার করেছে।
কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে দিনদুপুরে প্রাণঘাতী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের একের পর এক তাণ্ডবে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে সুপারমার্কেটের সরবরাহকেন্দ্র, ওষুধ ও চিকিৎসাকেন্দ্র এবং পণ্য রাখার গুদামগুলো।
এর ফলে হু হু করে বাড়ছে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা, দেখা দিচ্ছে খাবার ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট। হাড়কাঁপানো শীত যখন কড়া নাড়ছে, তখন ইউক্রেনের পানি সরবরাহ আর বিদ্যুৎ গ্রিড গুঁড়িয়ে দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে রাশিয়া।
এটি যেন ভ্লাদিমির পুতিনের এক নৃশংস রূপ। হার মেনে নেওয়ার চেয়ে তিনি বরং ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাওয়াই শ্রেয় মনে করছেন।
রুশ প্রধান নাকি সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, তাঁর এই ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ একদম পরিকল্পনামতোই এগোচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো তাঁর কথা বিশ্বাস করতে পারেন, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মোটেই তা করছেন না। সামরিক দিক থেকে সুবিধা করতে না পেরে এবং বিশালসংখ্যক সৈন্য হারিয়ে তাঁর সরকার এখন ভেতরে–ভেতরে তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে।
ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছেতা সত্ত্বেও পুতিনের ধারণা, শেষ একটা বড় ধাক্কা দিয়েই হয়তো ইউক্রেনের মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব। মাসের পর মাস হাত গুটিয়ে বসে থাকার পর ট্রাম্পের নতুন মধ্যস্থতার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তিনি তাঁর বিশেষ প্রতিনিধিদের মস্কো ও কিয়েভে পাঠিয়েছেন, যা ক্রেমলিনকে জয়ের কাল্পনিক আশ্বাসই জোগাচ্ছে। একদিকে আলোচনার টেবিল গরম করা হচ্ছে, আর অন্যদিকে প্রতিদিন ঝরছে নিরপরাধ মানুষের রক্ত। প্রতিদিনই ঘটছে মানবতাবিরোধী অপরাধ।
প্রতিদিনের এই গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, অনাহার আর লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি হারানোর এ চিত্র কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তবে প্রশ্ন ওঠে, পশ্চিমা মিত্র ও ন্যাটো কেন এ তাণ্ডব থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না?
এর মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অস্পষ্ট নীতি, যা ইউক্রেনকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২২ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনীয়দের সাহায্যের আশ্বাস দিলেও পরে তাদের একপ্রকার ভাসিয়ে রেখে গেছেন। আর ট্রাম্প এসে যেন তাদের পুরোপুরি ডুবিয়ে মারার ব্যবস্থা করছেন।

স্থলযুদ্ধে রাশিয়াকে রুখে দিলেও ইউক্রেন এখন বিমান হামলার মুখে চরম অসহায়। ট্রাম্প ইউক্রেনকে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বাধা দেওয়া এবং অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপও এ ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের তোষামোদপূর্ণ সম্পর্ক এবং ইউক্রেনীয়দের ওপর তাঁর রাজনৈতিক চাপ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকেই আজ ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
তবে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষও দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে ক্লান্ত। সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, ৬০ শতাংশ মানুষ জমি ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে হলেও একটা বড় অংশই এখন স্থায়ী নিরাপত্তার শর্তে যুদ্ধবিরতি চায়। রাশিয়ার সাধারণ মানুষও এই সংঘাতের অবসান দেখতে চায়।
এই চিরন্তন যুদ্ধগুলোর জন্য শেষ পর্যন্ত দায়ী অযোগ্য ও নির্বোধ রাজনৈতিক নেতারা। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি বা জেনারেলরা ভুল করতে পারেন, পরিকল্পনা ভেস্তে যেতেই পারে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো সেই রাজনীতিবিদদের নিয়ে, যাঁরা আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দেন, শত্রুকে দুর্বল ভাবেন, শান্তির পথ এড়িয়ে যান এবং নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে মুখে স্পষ্ট মিথ্যা বলেন।
কিন্তু জনগণের এই চাওয়ার কোনো মূল্য পুতিন বা ট্রাম্প কারোর কাছেই নেই। একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের নেতাদের এই উদাসীনতাই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধগুলোকে টিকিয়ে রাখে। ইউক্রেন, গাজা কিংবা অন্য অঞ্চল—সবখানেই সাধারণ মানুষ আজ শুধুই অসহায় দর্শক। দীর্ঘদিনের সহিংসতার দৃশ্য দেখতে দেখতে মানুষের অনুভূতিগুলোও যেন এখন বোবা হয়ে গেছে।
কার্যকর ও নিরপেক্ষ কোনো শান্তিপ্রক্রিয়া না থাকাটাই ইউক্রেনের মতো ইরান ও ফিলিস্তিনের সংঘাতগুলো থামানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শূন্যতাই মূলত আধুনিক যুগের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতগুলোকে উসকে দিচ্ছের
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন-রাশিয়া বিতর্কে আনাড়ির মতো নাক গলিয়েছেন এবং একটি পক্ষকে স্পষ্টতই সমর্থন দিয়েছেন। পুতিনের নিজ থেকে বেছে নেওয়া এই যুদ্ধের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে তিনি কখনোই ভাবেননি। জীবন বাঁচানো নয়, বরং ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার বাগানো এবং রাশিয়ার লাভজনক জ্বালানিচুক্তি হাসিল করা।
ইউক্রেন নিয়ে ইউরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছেট্রাম্প-পুতিনের ইউক্রেন ছকের বিরুদ্ধে কতক্ষণ টিকবে ইউরোপএকইভাবে ট্রাম্পের স্বার্থান্বেষী মনোভাব গাজার বেসামরিক মানুষদের ইসরায়েলি বাহিনী ও হামাসের হাত থেকে রক্ষা করার আশাগুলোকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাঁর গঠিত ‘শান্তি বোর্ড’ এবং ২০ দফার পরিকল্পনা মূলত তাঁর ব্যক্তিগত অহংকার ও লোভ মেটানোর মাধ্যম, রাজনৈতিক বা মানবিক সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত পথ এটি নয়।
অন্যদিকে ইরান সংকট সমাধানের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই আগ্রহ হারিয়েছেন। পুতিনের মতো তিনিও নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করতে বা তেহরানের সঙ্গে কোনো আপসে যেতে নারাজ। তাঁর এই জেদ মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারী এবং উপসাগরীয় মিত্রদের অবস্থানকে দুর্বল করছে, যাঁরা আশঙ্কা করছেন এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সত্যি যা প্রয়োজন, তা হলো জাতিসংঘের ক্ষমতায়নপ্রাপ্ত নিরপেক্ষ শান্তিদূত, যিনি সব পক্ষকে টেবিলে বসাতে পারবেন।
১৯৪৫–পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি—আইনের শাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আদালতের (আইসিজে ও আইসিসি) তদারকিকে ট্রাম্প, পুতিন ও নেতানিয়াহুর মতো নেতারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। বিশ্বজনীন আইনি কাঠামো মেনে না চলার এই মানসিকতাই যুদ্ধগুলোকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

একবার নিয়ম ভেঙে গেলে যেকোনো অপরাধই যেন বৈধতা পেয়ে যায়। আর এর ফলেই ঘটে চলেছে একের পর এক নৃশংস যুদ্ধাপরাধ—যেমনটা গাজায়, ইউক্রেনের বুচা ও মারিউপোলে, কিংবা দক্ষিণ ইরানের মিনাবে ঘটেছে, যেখানে মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় শতাধিক স্কুলছাত্রী নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এটি যেন আইনি বৈধতা পাওয়া এক চিরন্তন নৈরাজ্য।
এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধগুলোর আরেকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীন গণমাধ্যম ও জাতিসংঘের তদন্তে বাধা সৃষ্টি করা। হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সাহসী সাংবাদিকদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সেখানকার প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হচ্ছে।
একইভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরান–সম্পর্কিত সামরিক অভিযানের খুব সামান্য তথ্যই প্রকাশ করছেন। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের সফল হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির খবর অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে।
ওদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকৃত তথ্য সেন্সর করছে। রুশ জনগণের একটি বড় অংশই জানে না, তাদের সামরিক বাহিনীর পরিস্থিতি কতটা শোচনীয়। মূলত সাধারণ মানুষের অসচেতনতাই এসব অপরাধ ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
এই চিরন্তন যুদ্ধগুলোর জন্য শেষ পর্যন্ত দায়ী অযোগ্য ও নির্বোধ রাজনৈতিক নেতারা। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি বা জেনারেলরা ভুল করতে পারেন, পরিকল্পনা ভেস্তে যেতেই পারে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো সেই রাজনীতিবিদদের নিয়ে, যাঁরা আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দেন, শত্রুকে দুর্বল ভাবেন, শান্তির পথ এড়িয়ে যান এবং নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে মুখে স্পষ্ট মিথ্যা বলেন।
এটি এক দীর্ঘদিনের সমস্যা, যার রাতারাতি কোনো সমাধান নেই। তবে ইউক্রেনের মানুষ, যারা সামনে চরম নারকীয় সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তাদের এখন জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা প্রয়োজন।
পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। মস্কোর এই বর্বরতার বিরুদ্ধে ন্যাটোকে এবার আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতেই হবে। সব ধরনের যুদ্ধাপরাধ বরদাশত না করার কঠোর বার্তা দিতে হবে এবং রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলোয় বিমান হামলার স্পষ্ট হুমকি দিতে হবে।
পুতিনের এই যুদ্ধ পুরো বিশ্বের যুদ্ধ হয়ে ওঠার আগেই তাকে থামতে বাধ্য করতে হবে।
সাইমন টিসডল দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কলামিস্ট। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।







