ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি পোশাকের বাজারে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ইইউর বাজারে চীন, ভারত, তুরস্ক, ভিয়েতনামসহ অন্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর রপ্তানিও কমেছে, তবে বাংলাদেশের মতো এত বড় পতন কারো হয়নি।
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউ বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ২ হাজার ৭৭৭ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ।
এই সময়ে বাংলাদেশ ইইউতে ৬০৯ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৭৫৪ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, ইইউর সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী চীন চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৭৯৫ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা ইইউর সামগ্রিক আমদানি কমার হারেরও নিচে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতির পর চীনা রপ্তানিকারকরা ইউরোপের বাজারে আরো আগ্রাসী মূল্যছাড় দিয়ে ক্রয়াদেশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কার্যকর হওয়ায় কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সেদেশে অর্ডার সরিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবেও ইউরোপে পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ইউরোপে ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা কমেছে, চীন আগ্রাসীভাবে বাজার দখলের চেষ্টা করছে এবং ভারতের এফটিএ কার্যকর হওয়ার সুফলও তারা পাচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মধ্যে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ, ভারতের ১২ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৮ শতাংশ, মরক্কোর ৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১৮ শতাংশ।
পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও চীনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ ৪৪ কোটি কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে চীনের রপ্তানি ৪১ কোটি কেজি। তবে দামের দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে গড়ে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো দরে, যেখানে চীনের গড় মূল্য ১৯ দশমিক ৪৪ ইউরো।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, চীন সরকারি সহায়তা নিয়ে কম দামে ক্রয়াদেশ নিতে পারছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, ব্যাংকিং খাতের সংকটের কারণে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ বা ১ হাজার ৭৩৬ কোটি ডলারের পোশাক গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। একই সময়ে এ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।








