রাজধানীতে শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়ক, অলিগলি এবং বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা ও জলজটে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ কারণে অফিসগামী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দুর্ভোগে পড়েন। অল্প সময়ে অতি বর্ষণে রোববার রুটিন কার্যক্রমগুলো নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোর অর্ধবার্ষিক ও প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক স্কুলে ঘোষণা করা হয় ছুটি। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া হয়েছে অনলাইনে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাগরে লঘুচাপ তৈরি হওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে অতি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। রাজধানীতে শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর পর থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৯৭ মিলিমিটার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। কোথাও ১ থেকে ২ ঘণ্টায় পানি সরে যায়। আবার কোথাও দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। জনবহুল ঢাকার কর্মব্যস্ত দিনে রোববার লাখো মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। এ সময় জলমগ্ন সড়কে শত শত মোটর সাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং প্রাইভেট কার অকেজো হতে দেখা যায়।
প্রবল বর্ষণ প্রসঙ্গে পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত যুগান্তরকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকাসহ সারা দেশে অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। দিনদিন এটি আরও বাড়বে; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু আমাদের দেখতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকার দুই সিটির ডোবা, নালা ও জলাশয়গুলো ভরাট হওয়ায় সামনের দিনগুলোয় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা অনেক বেশি। ঢাকার পানি নিষ্কাশনের যে অবস্থা, ভারি বৃষ্টি হলে তা যথাযথভাবে নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে না। এজন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ড. আইনুন নিশাত আরও বলেন, ঢাকার ভূপ্রকৃতি হলো মাঝখানটা উঁচু এবং চারদিকে নিচু; ঠিক যেন কচ্ছপের পিঠের মতো। ২০১৫ সালে ঢাকার জলাবদ্ধতা বা পানি নিষ্কাশন বিষয়ে একটি গবেষণা করা হয়। সেখানে জলাবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধিতে ঢাকার বিদ্যমান বাস্তবতায় করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা যায়, মৌসুমে ভারি বর্ষণে রোববার নগরীর বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কাওরান বাজার, ধানমন্ডি, মিরপুরের কাজীপাড়া, সচিবালয়, কালশীসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি জমে গেছে। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান পানি থাকায় যানবাহনের গতি কমে যায় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভারি বৃষ্টির কারণে মিরপুরের কিছু এলাকার রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, ক্যাম্প, বস্তি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। মিরপুরে ১, ২, ১০, ১৩ নম্বর বিআরটিএ, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, আনসার ক্যাম্প, কালশী, সাংবাদিক আবাসিক এলাকা, মিরপুর-১২ নম্বর ‘বি’ ব্লক, বাইশটেকি, মিরপুর-১১ অ্যাভিনিউ ফাইভে জলজটে রীতিমতো নাকাল হয়েছে মানুষ।
নগরীর খিলগাঁও, গোড়ান, তালতলা, সবুজবাগ, মুগদা, মানিকনগর, মতিঝিল, মালিবাগ, মৌচাকসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে জলজটের সৃষ্টি হয়। অনেক এলাকায় ফুটপাত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করেন। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার টোল গেটসংলগ্ন কাজলা সড়ক হাঁটুসমান পানিতে ডুবে থাকতে দেখা গেছে।
মহাখালীর বাসিন্দা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. জাহিদ হাসান যুগান্তরকে জানান, পাঁচ বছর পেছনে তাকালে ঢাকার সড়কে এত পানি দেখছেন বলে তার মনে পড়ে না। রোববার বাসে করে মহাখালী থেকে কুড়িল যাওয়ার সময় সড়কের পানিতে বাসের দরজা ডুবে যেতে দেখেছেন তিনি। সড়কে গাড়ি অকেজো হয়ে পড়ে থাকতেও তিনি দেখেছেন। বনানীর প্রধান সড়কের জমাট পানি দেখে মনে হয়েছে-এটা যেন খাল, কোনো সড়ক নয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভারি বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলজট ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এরপর বৃষ্টিতে যাতে ওইসব এলাকায় পানি না জমে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, টানা ভারি বর্ষণে সড়কে জমে থাকা পানি অপসারণে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন। সাময়িক দুর্ভোগের মধ্যে ধৈর্যধারণ করে নগরবাসীকে পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ঢাকার জলজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে তিনি সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।








