জনস্বার্থ–সম্পর্কিত কিছু কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত করতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ নামে নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই নীতিমালা তৈরি করছে। এই নীতিমালার অধীন জনস্বার্থ–সম্পর্কিত কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হবে।
রাজধানীর নিকুঞ্জে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কার্যালয়ে আজ সোমবার আয়োজিত এক সংলাপে এ তথ্য জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। দেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে এ সংলাপের আয়োজন করে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)।
অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, অনেকেই অভিযোগ করেন, ভালো কোম্পানি বাজারে আসতে চায় না। তবে সিকিউরিটিজ আইনে জনস্বার্থে যেকোনো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা বিএসইসির আছে। সেই আইনি ক্ষমতা কার্যকর করতে শিগগিরই পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি নামে একটি নতুন নীতিমালা করা হবে। এই নীতিমালার অধীন নির্ধারিত কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে আবেদন করতেই হবে।
এ ছাড়া ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ম এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডিরেক্ট লিস্টিং) প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে বলে জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বর্তমানে আইপিও প্রক্রিয়ায় ডিএসই ও বিএসইসি—উভয় জায়গায় নথিপত্র জমা, বারবার নথিপত্র পরীক্ষা ও প্রশ্ন–উত্তরের কারণে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আবেদন জমার পরে ২০ বছরের আর্থিক বিবরণী চাওয়ার ঘটনাও আছে। এসব করতে করতে রোগী মারা যায় (কোম্পানি তালিকাভুক্তি হয় না)। এ জটিলতা কাটাতে এখন থেকে কোম্পানিগুলো আইপিও আবেদন সরাসরি ডিএসই বা সিএসইতে জমা দেবে। বিএসইসি আগ্রহী কোম্পানিকে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করবে না, সব প্রশ্নের সমাধান করবে এক্সচেঞ্জগুলো। এ ছাড়া নিরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন বিধান চালু করা হবে, যেখানে কোম্পানির জমি, যন্ত্রপাতি, দেনা-পাওনার বাস্তব সত্যতা যাচাই করবেন নিরীক্ষকেরা। নিরীক্ষকদের সনদের ওপর ভিত্তি করে স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির বিজনেস মডেল ও সম্পদের মূল্যায়ন করবে। আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন এই আইপিও বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য পাঠানো হবে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি আইপিও প্রক্রিয়ার বাইরে দ্রুত পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির আনার সুবিধার্থে সরাসরি তালিকাভুক্তি এবং হাইব্রিড (আইপিও ও সরাসরি তালিকাভুক্তি উভয়ই) পদ্ধতি চালু করা হবে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান জানান, সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিবিধান তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই বিএসইসি এটি অনুমোদন দিয়ে জনমতের জন্য পাঠাবে। দুই মাসের মধ্যে সব কাজ শেষ হতে পারে। এই পদ্ধতিতে কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার সরাসরি বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে দু–তিন মাসের মধ্যে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। ইতিমধ্যে অনেকগুলো ভালো কোম্পানি এই প্রক্রিয়ায় আসার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কিছু কোম্পানি বাজারে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে এসব নিয়মকানুন চালু হলে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসা শুরু করবে। ইতিমধ্যে অনেক ভালো কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে তাদের অনেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে। তাতে বাজারের প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে।
আকস্মিক পরিদর্শন চালানো হবে
এদিকে সুশাসনের স্বার্থে পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে (সিসিএ) ঘাটতির মতো অনিয়ম রোধে তদারকি জোরদার করতে রিস্ক বেজড অ্যাপ্রোচ এবং নিয়মিত ‘সারপ্রাইজ ইন্সপেকশন’ বা আকস্মিক পরিদর্শন চালানো হবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
এ বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, আগে পরিদর্শনের খবর পেলে সাময়িকভাবে হিসাব ঠিক করে ফেলার নজির রয়েছে। অনিয়ম ঢাকতে যেন কোনো সুযোগ না পাওয়া যায়, সে জন্যই এই আকস্মিক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনিয়ম ও কারসাজি নজরদারিতে বিএসইসি এবং ডিএসই—উভয় প্রতিষ্ঠানেই এআই-বেজড (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক) সার্ভিল্যান্স সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক গতিবিধিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানিয়েছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, ‘কমিশনের কাজ সূচক টেনে তোলা বা টার্নওভার নিয়ন্ত্রণ করা নয়। পৃথিবীর কোথাও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূচক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে না। শেয়ারবাজার তার স্বাভাবিক গতিতেই চলবে। আমরা বিএসইসি থেকে কোনো ব্রোকারেজ হাউসে ফোন দেইনি, দেবও না। বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলবে। তবে অস্বাভাবিক শেয়ার লেনদেন বা কারসাজি হলে তদন্ত করা হবে।’








