আল্লাহর সৃষ্টি এই পৃথিবী অপরিসীম বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। দেশ, জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্য মানুষের জন্য শিক্ষা ও চিন্তার এক বিশাল ক্ষেত্র। ভ্রমণ মানুষকে নতুন অভিজ্ঞতা দেয়, জ্ঞানের দুয়ার উন্মুক্ত করে এবং ভিন্ন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে।
ইসলামও ভ্রমণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে বারবার মানুষকে পৃথিবীতে ভ্রমণ করে আল্লাহর নিদর্শন, পূর্ববর্তী জাতির পরিণতি এবং সৃষ্টিজগতের রহস্য নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করেনি, যার ফলে তারা উপলব্ধিকারী হৃদয় ও শ্রবণকারী কানের অধিকারী হতো?’ (সূরা আল-হাজ: ৪৬)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখ, তিনি কীভাবে সৃষ্টির সূচনা করেছেন।’ (সূরা আল-আনকাবুত : ২০)। এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, ভ্রমণ শুধু বিনোদনের জন্য নয়; বরং জ্ঞান, ইমান ও আল্লাহর মহিমা উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ভ্রমণের গুরুত্বের কারণে ইসলাম সফরকারীদের জন্য বিশেষ বিধান দিয়েছে। চার রাকাতের ফরজ নামাজ কসর করে দুই রাকাত আদায়ের অনুমতি, রমজানে সফর অবস্থায় রোজা স্থগিত রেখে পরে কাজা করার সুযোগ এবং অভাবগ্রস্ত মুসাফিরকে জাকাতের উপযুক্ত হিসাবে গণ্য করার বিধান ইসলামে ভ্রমণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। এ কারণেই অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ভ্রমণকে ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানার্জন ও দ্বীন প্রচারের জন্য মুসলিমদের দীর্ঘ সফরের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা মরক্কো থেকে চীন পর্যন্ত ভ্রমণ করে মুসলিম সমাজের আন্তরিক আতিথেয়তা ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। তার সফরনামার অনুবাদক এইচ. আর. গিব উল্লেখ করেন, ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধই ইবনে বতুতার দীর্ঘ সফরকে সহজ করেছিল। একইভাবে সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই আরবের বাইরে আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের কবরের সন্ধান পাওয়া যায়।
ভ্রমণ নিরাপদ হওয়াও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে একজন নারীও হিরাত থেকে মক্কা পর্যন্ত একাকী সফর করতে পারবে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না। হজরত আদি ইবন হাতিম (রা.) বর্ণিত এ ঘটনা সহিহ আল-বুখারিতে উল্লেখ রয়েছে। এটি ইসলামের নিরাপদ জনপদ প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ভ্রমণের শিষ্টাচারও শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনজন একসঙ্গে সফর করলে তাদের একজনকে নেতা নির্ধারণ করা উচিত (সুনান আবু দাউদ)। অপর হাদিসে তিনি তিনজনের দলবদ্ধ সফরকে অধিক কল্যাণকর বলে উল্লেখ করেছেন (জামি আত-তিরমিজি)। এর মাধ্যমে সফরে শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
ভ্রমণ মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি মানুষকে ধৈর্যশীল, সহনশীল ও উদার করে তোলে। বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে সংকীর্ণতা দূর হয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। প্রখ্যাত মুসলিম মনীষী আবু রায়হান আল-বিরুনি ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে উল্লেখ করেছিলেন, বিচ্ছিন্নতা ও বিদেশ ভ্রমণের অভাব অনেক সময় মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার জন্ম দেয়। তার মতে, ভিন্ন সমাজ ও সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় মানুষকে সত্যের প্রতি আরও উন্মুক্ত করে।
ভ্রমণের অন্যতম বড় অর্জন হলো অভিজ্ঞতা। নতুন পরিবেশে মানুষ যেমন ভালো মানুষের সংস্পর্শে আসে, তেমনি কখনো প্রতারণারও শিকার হতে পারে। তবে ইসলাম এসব অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুমিন একই গর্ত থেকে দুইবার দংশিত হয় না।’ (সহিহ আল-বুখারি)। অর্থাৎ একজন মুমিন অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে আরও বিচক্ষণতার সঙ্গে চলবে।
সফরে বের হওয়ার আগে আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তার স্মরণে দোয়া পাঠ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম; আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।’ (জামি আত-তিরমিজি)।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট








