জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন কারখানার শ্রমিক সাব্বির ইসলাম। মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পরও কাটেনি তার পরিবারের সংকট। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছেন স্ত্রী ফরিদা আক্তার। মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় কখনো ভাড়া বাসায় আবার কখনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েই চলছে তাদের জীবন।
নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার খাদ্যগুদাম সংলগ্ন পোস্ট অফিস রোডের একটি ভাড়া বাসায় থাকছেন শহীদ সাব্বিরের পরিবার। এর আগে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় একাধিকবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে তাদের। কয়েক দফা আশ্রয় নিতে হয়েছে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও।
ফরিদা আক্তারের বড় ভাই মো. চঞ্চল মিয়া বলেন, “সাব্বির মারা যাওয়ার পর থেকেই পরিবারটি চরম সংকট পড়েছে। ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় বারবার বাসা বদল করতে হচ্ছে। আত্মীয়দের বাড়িতে কিছুদিন থাকা গেলেও সেটি স্থায়ী সমাধান নয়। আমার বোন তার সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছে।”
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার ভাড়া বাসা থেকে বের হন সাব্বির ইসলাম (৪৪)। প্রতিদিনের মতো কাজের সন্ধানে বের হলেও উত্তাল পরিস্থিতিতে তিনি সরকার বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। একটি গুলি ডান কানের পাশ দিয়ে মাথায় ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ নিজ জেলা নেত্রকোণায় আনা হলে ৬ আগস্ট জানাজা শেষে আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামে শ্বশুর জামাল উদ্দিনের জমিতে তাকে দাফন করা হয়।
নিহত সাব্বির উপজেলার লুনেশ্বর ইউনিয়নের খিলা বামুন্দি গ্রামের মৃত শুকুর আলীর ছেলে। প্রায় দুই দশক আগে বানিয়াজান গ্রামের জামাল উদ্দিনের মেয়ে ফরিদা আক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এলাকায় দিনমজুরি ও বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালাতেন। পরে জীবিকার তাগিদে আশুলিয়ায় গিয়ে একটি সরিষার তেলের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে কর্মহীন হয়ে পড়েন। ধারদেনা করে সংসার চালানোর মধ্যেই গুলিতে প্রাণ হারান তিনি।
স্বামী সাব্বিরের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে ফরিদা আক্তার
সাব্বিরের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ১২ বছরের ছেলে মমিন মিয়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বড় মেয়ে লিজা আক্তার পঞ্চম শ্রেণির পর পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটে অন্য সন্তানদের পড়ালেখাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ভাড়া বাসার জরাজীর্ণ বারান্দায় বসে ফরিদা আক্তার বলেন, “সেদিন সকালে আমার স্বামী বলেছিল, বাজার নিয়ে আসবে। কাজ না পেলে আন্দোলনে থাকবে। সরকার পতন হয়েছে, কিন্তু আমার স্বামী আর ফিরে আসেনি। এখন চার সন্তান নিয়ে কোথায় যাব জানি না। নিজের কোনো জায়গা নেই। ভাড়া দিতে না পারলে বাসা ছাড়তে হয়।”
তিনি বলেন, “ছেলেটা প্রতিবন্ধী, মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি। সরকার থেকে যে সহায়তা পাই, তা দিয়ে কোনোরকমে চলি। সরকার যদি মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই করে দিত, তাহলে এত কষ্ট হতো না। ঘর ছাড়া মেয়েগুলোকে কীভাবে বিয়ে দেব?”
স্থানীয় বাসিন্দা আল আকরাম খান বলেন, “একজন শহীদের পরিবার এভাবে মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, এটা খুবই কষ্টের। তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে জমিসহ একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”
আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহনুর রহমান বলেন, “পরিবারটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছে। তাদের নিজস্ব জমি না থাকায় নীতিমালা অনুযায়ী খাসজমিসহ একটি ঘরের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে।”








