মাথায় বৃষ্টির পানি আর পায়ে গোড়ালিসমান কাদা- এভাবেই ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রধান বাজার থেকে ফিরছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আবু সালেক বাবু। সকালের ছককাটা পরিকল্পনা ছিল প্রয়োজনীয় বাজার সেরে দ্রুত বাসায় ফেরার। কিন্তু বাজারের প্রবেশমুখেই তার গতি রোধ করে কাদামাখা ভাঙাচোরা রাস্তা। কাদা এড়াতে রাস্তার পাশে দাঁড়াতেই বহুতল ভবনের ছাদের পাইপ থেকে পড়া নোংরা পানি ভিজিয়ে দেয় তার পুরো শরীর।

এটি কেবল বাবুর একার গল্প নয়; বৃষ্টি, কাদা আর ছাদের পাইপের পানির ত্রিমুখী ভোগান্তিতে নাকাল কালীগঞ্জ পৌর বাজারের হাজারো ক্রেতা ও ব্যবসায়ী।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে সরেজমিনে কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রধান বাজার ঘুরে দেখা যায়, টানা বর্ষণে বাজারের অভ্যন্তরীণ সড়ক কাদা, পানি আর খানাখন্দে একাকার। কোথাও কোথাও হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন আগে পৌরসভার উদ্যোগে ইটের খোয়া ও বালি ফেলা হলেও টানা বৃষ্টিতে তা উল্টো কাদার সঙ্গে মিশে আরো ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাজারসংলগ্ন ভবনগুলোর পানিনিষ্কাশনের পাইপ, যেগুলো সরাসরি রাস্তার ওপর দিয়ে পানি ফেলছে। ফলে পথচারীরা কাদা এড়াতে পাশে গেলেও ভিজতে হচ্ছে ওপর থেকে পড়া পানিতে।

আবু সালেক বাবু বলেন, “কালীগঞ্জের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত বাজার এটি। আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দূরদূরান্তের মানুষ প্রতিদিন এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। অথচ বাজারের ভেতরের রাস্তার এমন বেহাল অবস্থা যে, বাইরের কেউ এলে সহজেই বুঝতে পারবেন কতটা অবহেলিত এটি।”

তিনি আরো বলেন, “পৌরসভা থেকে কয়েক দিন আগে যে ইটের খোয়া ও বালি ফেলা হয়েছে, তা বর্ষার বৃষ্টিতে আরো দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। দ্রুত আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে রাস্তাটি সংস্কার করা প্রয়োজন।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কালীগঞ্জ পৌর এলাকায় একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় বাজারে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন নতুন ব্যবসায়ীও জীবিকার আশায় দোকান খুলেছেন। কিন্তু বাজারের অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে সম্ভাবনাময় এই বাজার তার পূর্ণ সক্ষমতা হারাচ্ছে। এতে যেমন সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরাও।

কালীগঞ্জ বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী ফারুক দেওয়ান বলেন, “কয়েক দিন আগে পৌরসভা তড়িঘড়ি করে কিছু ইটের খোয়া ও বালি ফেলেছিল। তখন কয়েক দিন বৃষ্টি না থাকায় ভালোই মনে হয়েছিল। কিন্তু টানা বর্ষণে এখন সেটিই কাদার সঙ্গে মিশে চলাচল আরো কঠিন করে তুলেছে।”

তিনি বলেন, “রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটা যায় না। তাই মানুষ পাশ দিয়ে চলতে চায়। কিন্তু ভবনের পানির পাইপগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যে সামান্য বৃষ্টিতেই সেই পানি পথচারীদের গায়ে এসে পড়ে।”

ব্যবসায়ী মো. আলামিন হোসেন বলেন, “এখন বাজারের অবস্থা এমন যে চাইলে এখানে ধানের চারা রোপণ করা যাবে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই চিত্র দেখা যায়। কিন্তু স্থায়ী সমাধানে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।”

আরেক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, “ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পাইকারি ব্যবসায়ী-সবাই ক্ষতির মুখে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে। কাদা-পানির কারণে ক্রেতারা বাজারে আসতে চান না। এতে প্রতিদিনই বিক্রি কমে যাচ্ছে। দ্রুত বাজারের সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা না হলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।"

কালীগঞ্জ কেন্দ্রীয় মসজিদের মুসল্লি ফারুক আহমেদ বলেন, “মুসল্লিদের দুর্ভোগের বিষয়টি উপজেলা ও পৌর প্রশাসনকে আগেই জানানো হয়েছিল। পরে যে কাজ করা হয়েছে, তা মানুষের কষ্ট কমানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে রাস্তাটি নির্মাণ করা প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মন্নুর আহমেদ বলেন, “সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে কয়েক দিন আগে প্রাথমিকভাবে কিছু কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু টানা বর্ষণে পরিস্থিতি আবারো খারাপ হয়েছে। পৌর প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”

কালীগঞ্জ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (পিএনও) শ্যামল কুমার দত্ত বলেন, “পৌরসভার প্রশাসনিক ও প্রকৌশল-দুটি পৃথক বিভাগ রয়েছে। আমি প্রশাসনিক দায়িত্বে আছি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। প্রকৌশল বিভাগকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জানানো হবে।”

কালীগঞ্জ পৌর প্রশাসক এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, “বাজারের সড়কের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। বর্ষার কারণে সাময়িকভাবে কিছু সংস্কারকাজ করা হলেও অতিবৃষ্টিতে সেটি কার্যকর থাকেনি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকৌশল বিভাগকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্ষা পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আরসিসি সড়ক নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটে।”