টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর আওতায় বাস্তবায়িত কমিউনিটি-ভিত্তিক ১০ বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে। প্রায় চার বছর আগে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬০ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে দুই উপজেলার জন্য প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯ টাকা ৯০ পয়সা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩৬টি পয়েন্টে সাবমার্সিবল পাম্প, গভীর নলকূপ, ৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক, পাইপলাইন এবং ১০টি পরিবারে পানি সরবরাহের সংযোগ দেওয়ার কথা ছিল। জায়গা সংকটের কারণে ধনবাড়ীর একটি পয়েন্ট বাদ পড়ে। ফলে ৩৫টি পয়েন্টে কাজ হওয়ার কথা। সরেজমিন বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্থানে কেবল বোরিং বা পাম্প বসানো হয়েছে। কোথাও ট্যাংক নেই, কোথাও পাইপলাইন নেই, কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ হয়নি। আবার কোথাও ট্যাংকের স্ট্যান্ড তৈরি হলেও ট্যাংক বসানো হয়নি। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, মোট কাজের ৩০ শতাংশও শেষ হয়নি। অথচ অফিসের তথ্য অনুযায়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জামালপুরের খন্দকার এন্টারপ্রাইজ ইতোমধ্যে ৮৯ লাখ ৫৮ হাজার ১২৯ টাকা ৭৮ পয়সা, অর্থাৎ মোট বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ বিল উত্তোলন করেছেন। মধুপুর উপজেলার মহিষমারা, কুড়ালিয়া, গোলাবাড়ী, আলোকদিয়া, আউশনারা, শোলাকুড়ি, কুড়াগাছা, মির্জাবাড়ী ও ফুলবাগচালা ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কাজ পূর্ণাঙ্গ হয়নি। মহিষমারা ইউনিয়নের নেদুর বাজার এলাকার নজরুল ইসলামের বাড়িতে পাইপ বসানোর কিছুটা কাজ করা হয়েছে। ওই এলাকার জোসনা বেগম, জহুরা বেগম ও নাছিমা বেগম জানান, প্রায় চার বছর আগে তাদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং ১০টি পরিবারের কাছ থেকে মোট ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। বলা হয়েছিল সরকার বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু একটি পাইপ বসানো ছাড়া আর কোনো কিছুই হয়নি।

কুড়ালিয়া ইউনিয়নের টিকরী গ্রামের আরিফ হোসেনের বাড়ির পয়েন্টে পাম্পসহ ট্যাংক, পাইপ লাইন বসার কথা। আরিফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘চার বছর আগে ট্যাংক বসানোর জন্য পিলার নির্মাণ করা হয়। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি।’ আউশনারা ইউনিয়নের বোকারবাইদ গ্রামের আছর আলীর বাড়িতে শুধু সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হয়েছে। ট্যাংক না থাকায় কোনো পরিবারেই পানি সরবরাহ চালু হয়নি। শুধু তার বাড়ি পানির সুবিধা পাচ্ছে।

মধুপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভুক্তভোগীরা জানান, প্রকল্প শুরুর সময় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ১০টি পরিবারের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও প্রায় ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল, সরকারিভাবে সাবমার্সিবল পাম্প, পানির ট্যাংক ও বাড়ি পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও অধিকাংশ পরিবার কোনো সুবিধা পায়নি। অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করে তারা শুধু আশ্বাস পেয়েছেন। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খন্দকার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরিফ খন্দকারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপসহকারী প্রকৌশলী আল আমিন বলেন, ধনবাড়ীর বেশির ভাগ এবং মধুপুরের কয়েকটি কাজ সম্পন্ন হওয়ায় ঠিকাদারকে ৬০ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সে সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক কিছু তাদের ইচ্ছামতো করতে হয়েছে। নিয়ম মতো করা সম্ভব হয়নি।