দেখতে দেখতে ৫০ বছরে পা দিতে চলেছে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। কিন্তু এই সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালেই মেলার আয়োজন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম জটিলতা। 

১৯৭৬ সাল থেকে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড এককভাবে এই মেলার আয়োজন করে আসছিল। কিন্তু এবার পশ্চিমবঙ্গের নতুন শাসক দল বিজেপি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বইমেলার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবে কি না, তা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে আলোচনা ক্রমশ বাড়ছিল। স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না মিললেও অবশেষে সোমবার (২৯ জুন) এ বিষয়ে কিছুটা ইঙ্গিত মিলেছে। 

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজক সংস্থা গিল্ডের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে নানা ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল প্রকাশক থেকে কবি–সাহিত্যিক অনেকের মধ্যেই। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ঘনিষ্ঠ একটি নতুন প্রকাশক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায়। মুদ্রক, প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতার মহাসংঘ, বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদ (বিজিপি) নামের ওই সংগঠন আত্মপ্রকাশের পরেই, সোমবার প্রয়াত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মহাজাতি সদনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। 

প্রধান বক্তা হিসেবে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, আরএসএসের পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের সহ-প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু, রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার, কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহর কন্যা মালিনী গুহ, এই সংগঠনের সভাপতি নির্গুণানন্দ ব্রহ্মচারী, সপ্তর্ষি চৌধুরী-সহ গিল্ডের দুই শীর্ষ কর্তা, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি- ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু শেখর দে সহ শতাধিক সাহিত্যিক, প্রকাশক।

অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যে শমীক ভট্টাচার্য গিল্ড কর্তাদের উপস্থিতিতেই একটা বিষয় স্পষ্ট করে দেন যে, বইমেলা আয়োজক সংস্থা হিসেবে গিল্ডের একাধিপত্যের দিন ফুরোতে চলেছে। একইসঙ্গে ৫০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ বিজেপি ঘনিষ্ঠ কোনো সংগঠন হাতে নেবে না, এমন সম্ভাবনা নেই বলেও শমীক বুঝিয়ে দেন। বইমেলা আয়োজন সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকবে কী না সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেননি শমীক। তবে বইমেলা আয়োজনে গিল্ডকে ‘মিলেমিশে’ আয়োজন’ করতে হবে এবং এই বিষয়ে নতুন কোনো ব্যবস্থা আসতে চলেছে বলে কার্যত স্পষ্ট করে দেন শমীক ভট্টাচার্য। 

শমীক বলেন, ‘‘আমরা এখানে বইমেলা বা প্রকাশকদের উপরে কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে আজকের সভায় আসিনি। আমরা চাই, বইমেলাই হোক বা প্রকাশকই হোন, সবাই মিলেমিশে আমরা নতুনভাবে কিছু মানুষের সামনে উপস্থাপিত করব।’’ 

শমীক বলেন, “এই বইমেলাতে লাইন দিয়ে পাঠক বই কেনেন, এটা অন্য কোনো বইমেলায় দেখা যায় না।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, একাধিক বিষয়ে এই মেলা নিয়ে ক্ষোভ থাকে। বইমেলায় জায়গা পাওয়া- না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ, সংগঠনে বিচ্যুতি কাঙ্ক্ষিত না হলেও তা ঘটেই থাকে। সেই জায়গা কাটিয়ে উঠতে হবে।”

এর পরেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি মনে করিয়ে দেন শিল্পক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ না করার বিষয়টিও। শমীক বলেন, “বইমেলায় রাজনৈতিক একাধিপত্য চলতে পারে না। রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ একাধিপত‍্য প্রতিষ্ঠা করার জায়গা বইমেলা নয়। যে যার মতো যাতে মতপ্রকাশ করতে পারেন তার জন্য পরিসর দিতে হবে। সাহিত্য জগতে দীর্ঘদিন একটা অস্পৃশ্যতা কাজ করেছে। মত প্রকাশের অধিকার তো সবার আছে। আমরা চাই, আগামী দিনে যে বইমেলাটা হবে, সে বইমেলায় যেন সম্পূর্ণ একটা ভারতীয়ত্বের ছাপ থাকে।’’ 

উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে তার সংযোজন, “পশ্চিমবঙ্গে এতদিন যে দল সরকারে এসেছে, সেই দলের হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এখন এমন একটি সরকার তৈরি হয়েছে যারা কোনো দলের সরকার হবে না, মানুষের সরকার হবে। আজ এখানে আমি দলের প্রতিনিধিত্ব করছি। কিন্তু সরকারের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকলে ভালো হতো। আপনাদের অনেকের অনেক অভিযোগ আছে, অভিমান আছে। সরকারের প্রতিনিধি থাকলে আপনারা তাদের কাছে তুলে ধরতে পারতেন।”

একইসঙ্গে বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত প্রত্যেকের। বিরুদ্ধ মতকে স্বাগত জানানোর বার্তা দিয়ে বলেন, “আমরা চাই যেকোনো ভাবনার সাহিত্য চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ এবং জায়গা থাকা উচিত। একজন বামপন্থি মানুষ মার্ক্সীয় সাহিত্য চর্চা করবেন, বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।”

কিন্তু বিজেপি ঘনিষ্ঠ যে সংগঠনকে ঘিরে এত গুঞ্জন, তারা বলছে নতুন এই সংগঠন তৈরির ভাবনা তাদের বহুবছরের। মূলত আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রবাদ, বহুত্ববাদ থেকেই জন্ম এই ভাবনার। তবে সংগঠন আকারে আত্মপ্রকাশ ১ জুন। ২০ জুন সংগঠনটি পালন করেছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস। এবার বুদ্ধদেব গুহর জন্মদিবস পালনের মধ্যে দিয়ে আবার প্রকাশ্যে।

লেখক-প্রকাশকদের নতুন সংগঠন বিজিপি কি তাহলে এবার বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব নেবে? সপ্তর্ষি সে সম্ভাবনা নস্যাৎ করেননি। আবার তেমন ভাবনার কথা স্বীকারও করেননি। বলেছেন, ‘‘সময় বলবে।’’

বিজিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বইমেলার নিয়ন্ত্রণ যে তাদের সংগঠন হাতে নিতে চায়, তেমন মন্তব্য করেননি। কিন্তু এবারের বইমেলার আয়োজন যে তাদের ‘মনের মতো’ই হতে হবে, সে কথা দেবজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছেন। দেবজিতের কথায়, বইমেলা, প্রকাশনী, নাটক, নাট্যশিল্প কোনো জায়গায় মুক্তচিন্তা প্রকাশের কোনো বাধা থাকবে না। তার মতে, মুক্ত চিন্তা ছাড়া শিল্প হয় না। এবার তার সূচনা হবে। আসন্ন বাংলার, ভারতের গর্ব আন্তর্জাতিক বইমেলার ৫০তম আয়োজনে সেই ভাবের প্রকাশ দেখা যাবে, একত্রিতভাবে, আশাবাদী তিনি।

গুঞ্জন অনুযায়ী কি তারা এবার রাশ ধরতে চাইছে বইমেলার? সংগঠনের নেতা অনির্বাণ জানান, সেটা ‘লজিক্যালি’ সম্ভব নয়। কারণ গিল্ড ১৮টি প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে গঠিত একটি বেসরকারি সংগঠন।

অন্যদিকে, বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদও তাই। পার্থক্য হলো- গিল্ড কেবল কলকাতাকেন্দ্রিক কিছু প্রকাশনা সংস্থাকে নিয়ে তৈরি, অন্যদিকে নতুন সংগঠন ছাতার তলায় আনছে জেলার প্রকাশনা সংস্থাগুলোকেও। কিন্তু একটি বেসরকারি সংগঠন, অপর বেসরকারি সংগঠনকে সরিয়ে জায়গা নিতে পারে না। ফলে চলতে হবে একত্রিতভাবে। সরকার কি রাশ ধরতে পারে বইমেলার? তেমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে তবে উত্তর মেলেনি।

গিল্ডের তরফ থেকে সুধাংশু শেখরও সোমবার বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বিজিপি-কে সঙ্গে নিতে তাদের আপত্তি নেই। সুধাংশুর কথায়, ‘‘নতুন কেউ যুক্ত হতে চাইলে অসুবিধা নেই। আমরা চাই আরো ভালোভাবে বইমেলা হোক। নতুন কেউ সঙ্গে এলে যদি আরো ভালোভাবে হয়, আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”

সুধাংশু বলেন, ‘‘গিল্ডই তো এতদিন বইমেলা করেছে। আমরা অন্যদেরও সঙ্গে নিয়েছি। একটা সময়ে ৯টি সংগঠন ছিল বইমেলার সঙ্গে। এখন আরো চারটি যুক্ত হলো। এবার মোট ১৩টি সংগঠন যুক্ত থাকবে।’” সুধাংশু আরো বলেন, “অনেক পরামর্শ এসেছে। আলোচনা হবে।”