রংপুরে মীরবাগ ডিগ্রী কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবু প্রতারণা মামলায় প্রায় দুই মাস কারাগারে বন্দী ছিলেন।
তবে অধ্যক্ষের কারসাজিতে তিনি ওই দুই মাসের বেতন পেয়েছেন।

এ বিষয়ে কলেজের উপস্থিতি রেজিস্ট্রারে আলী বাবুর শিক্ষা ছুটি উল্লেখ করা আছে। তবে এখনো ছুটি অনুমোদন হয়নি বলে স্বীকার করেছেন গভর্নিং বডির সভাপতি।

এদিকে, আদালত থেকে গত ২৩ এপ্রিল বাবুকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

দীর্ঘদিন পলাতক, কারাগারে বন্দী থাকা এবং আদালতের রায়ের পরেও তার চাকরি বহাল ছিল। এছাড়াও ছুটি অনুমোদনহীন, বেতন উত্তোলনের ঘটনায় অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হজে লোক পাঠানো ও চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেন মোহাম্মদ আলী বাবু। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে মামলাও করেন।

২০২৪ সালে হজে পাঠানোর নামে ৭৫ জন হজযাত্রীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে ওই বছরের ২০ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি পাঠায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এর আগে, হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা করায় দিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের হজ এজেন্সির পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বাবুসহ তিনজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠিও দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়।

২০২৪ সালের শেষ দিকে নীলফামারী থেকে বাবুকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন। তাকে আবারও গত ১৫ মে দিবাগত রাতে রংপুর মহানগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

কারাগারে থেকেও শিক্ষা ছুটির নামে বেতন পেলেন কলেজ শিক্ষকউপস্থিতি রেজিস্ট্রার খাতা

পুলিশ জানায়, বাবু কাউনিয়া উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের গধাদর গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে এবং ওই এলাকার মীরবাগ কলেজের প্রভাষক। হজে লোক পাঠানোর কথা বলে ও চাকরি দেওয়ার নামে অনেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। হজে যেতে না পারা এবং চাকরি না পাওয়া এমন একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। অর্থ আত্মসাতের প্রতারণার ঘটনায় মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে নীলফামারী থানায় দুইটি ও রংপুর আদালতে তিনটি মামলা রয়েছে।

পুলিশ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় থাকেন না এবং কলেজেও আসেন না বাবু। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
একপর্যায়ে গত ১৫ মে দিবাগত রাতে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আসামি বাবুর অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। গভীররাতেই কাউনিয়া থানা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে রংপুর মহানগর এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। পরের দিন ১৬ মে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় দুই মাস কারাগারে বন্দী থাকার পর তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন।

কারাগারে বন্দী থাকলেও কলেজ থেকে এমপিও সিটে তার নাম তালিকাভুক্ত করা হয় এবং গত মে ও জুন মাসের সমুদয় বেতনও দেওয়া হয়। তবে উপস্থিতি রেজিস্ট্রারে মোহাম্মদ আলী বাবুর নামের জায়গায় ১০ মে থেকে শিক্ষা ছুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রেজিস্ট্রারের একটি কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি সেকেন্দার আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী বাবু শিক্ষা ছুটির জন্য আবেদন দিয়েছেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে একটা রেজুলেশন হয়েছে। এখনো এ বিষয়টি অনুমোদন হয়নি। আগামী মিটিংয়ে শিক্ষা ছুটি সংক্রান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর কথা। এরপর এ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে।’

তবে শিক্ষা ছুটি অনুমোদনের আগেই কারাগারে থেকেও কীভাবে মে ও জুন মাসের বেতন পেলেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অধ্যক্ষ ভালো বলতে পারবেন।

প্রায় দুই মাস কারাগারে বন্দী থাকার পরও মোহাম্মদ আলী বাবু কীভাবে বেতন পেলেন, এ বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ফোনে কথা বলতে রাজি না হয়ে কলেজে গিয়ে দেখা করে বিস্তারিত জেনে নিতে বলেন।

মোহাম্মদ আলী বাবুর ব্যবহৃত একাধিক ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মো. গোলাম মাজেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওই শিক্ষকের শিক্ষা ছুটি ও বেতন উত্তোলনের বিষয়ে তার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবেন।’

জিতু কবীর/কেজে/এএসএম