শিল্পগোষ্ঠী আবদুল মোনেম গ্রুপের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারিকে বিশেষ ব্যবস্থায় আমদানি ঋণপত্র খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ–সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শতভাগ মার্জিন বা আমদানির পুরো অর্থ অগ্রিম জমা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি ঋণপত্র খুলতে পারবে। এক বছরের জন্য কোম্পানিটিকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ কক(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতার অনুকূলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের ঋণসুবিধা দিতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারিকে আইনের এই ধারা থেকে এক বছরের জন্য অব্যাহতি সুবিধা দিয়েছে। এ–সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আইনের এই ধারাটি আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারির ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। ফলে শতভাগ মার্জিন সুবিধার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি ঋণপত্র খুলতে পারবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে যে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে তার কোনো দায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। ফলে ঋণদাতা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই ধরনের ঋণের জন্য ভবিষ্যতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
জানা যায়, আবদুল মোনেমের চিনি শোধনাগার প্রতিষ্ঠানটিকে চালু রাখতে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে বিশেষ এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবদুল মোনেম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকার একটি খেলাপি ঋণের জামিনদার। নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের জামিনদারও খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো সুবিধা পাচ্ছিল না। এ অবস্থায় শোধনাগারটি চালু রাখতে প্রতিষ্ঠানটিকে আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিতে গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনি বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। সরকারের সম্মতি পাওয়ার পর আজ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে এক বছরের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এর আগে গত মাসের শুরুতে আমদানি ঋণপত্র খোলার বিশেষ সুবিধা চেয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের কাছে আবেদন করে আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুন থেকে আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি বা চিনি শোধনাগারটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের মালিকানাধীন স্মাইল ফুডস। এ–সংক্রান্ত শেয়ার ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী, দায়দেনাসহ আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি কিনে নেয় স্মাইল ফুডস। ওই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুন থেকে কারখানাটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্মাইল ফুডস। তবে ব্যাংকের দায়দেনা শোধ না হওয়ায় এখনো মালিকানা হস্তান্তর হয়নি। ফলে আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি নামেই এটির কার্যক্রম ও বন্ড সুবিধা পরিচালিত হচ্ছে। যেহেতু কাঁচামাল আমদানিতে প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধা পায়, তাই আবদুল মোনেম সুগার নামেই সেই সুবিধা নিতে হয়। কিন্তু ব্যাংকের খেলাপি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নামে আমদানি ঋণপত্র খুলতে গিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় স্মাইল ফুডসের পক্ষ থেকেই মূলত আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়।
জানতে চাইলে আবদুল মোনেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এস এম মঈনউদ্দিন মোনেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালের জুন থেকে কারখানাটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত নেই। এটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্মাইল ফুডস। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার গ্রুপটিকে আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। তবে ব্যাংক দায়দেনা মুক্ত না হওয়ায় এখনো কারখানাটির মালিকানা কাগজে–কলমে আমাদের হাতে রয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুন্সিগঞ্জে মেঘনাপাড়ে অবস্থিত আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৩ লাখ টন। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা বদলের চুক্তি যখন হয়, তখন ব্যাংকঋণ ও বন্ডের দায়দেনাসহ প্রতিষ্ঠানটির দায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। যার বড় অংশ স্মাইল ফুডসের পক্ষ থেকে পরিশোধের কথা ছিল। এসব দায়দেনা পরিশোধের পর মালিকানা হস্তান্তরের কাজটি সম্পন্ন হবে বলে জানান এ এস এম মঈনউদ্দিন মোনেম। তিনি বলেন, ‘মালিকানা আমাদের হাতে থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী কারখানাটি পরিচালনাসংক্রান্ত সকল ক্ষমতা স্মাইল ফুডসকে দেওয়া হয়েছে।’








