দক্ষিণ ভারতের কংগ্রেসশাসিত রাজ্য কর্ণাটকের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। আগের ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে প্রায় ১ কোটি ভোটারের নাম। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সত্ত্বেও এই ১ কোটির মধ্যে একজনও ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ খুঁজে পাওয়া যায়নি, ভারতের শাসক দলের নেতাদের ভাষায় যাঁরা ‘ঘুসপেটিয়া’।

গতকাল মঙ্গলবার কর্ণাটকের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা (সিইও) ভি আনবুকুমারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাদ যাওয়া ১ কোটি ভোটারের মধ্যে কতজন ‘বিদেশির’ খোঁজ পাওয়া গেছে? উত্তরে তিনি বলেন, সংখ্যাটা ১ হাজারেরও কম।

সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ নির্বাচন কমিশন সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, এসআইআরের পর রাজ্যে যত বিদেশির খোঁজ পাওয়া গেছে, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই নেপালি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও অন্য কয়েকটা দেশের কিছু নাগরিক আছেন। মূলত তাঁরা ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। ওই তালিকায় কোনো ‘বাংলাদেশি’ নাগরিকের নাম থাকার কথা রাজ্যের সিইও জানাতে পারেননি।

ভারতের ২৪ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের এসআইআর প্রক্রিয়ায় কতজন ‘বাংলাদেশি’ নাগরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেই তথ্য নির্বাচন কমিশন আজও দাখিল করেনি। বিরোধীরা বারবার সেই দাবি জানানো সত্ত্বেও কমিশন নীরব। বিরোধীরা বহুবার জানতে চেয়েছেন, কতজন ‘ঘুসপেটিয়া’ চিহ্নিত করা হয়েছে, কমিশন তা জানাক। কিন্তু কমিশন আজও নিরুত্তর।

ভারতে ইসি নিয়োগ বিলে বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন জগনমোহন, এখন অনুতপ্ত বলে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি

‘ঘুসপেটিয়া’ রাজনীতি নিয়ে যে দল সবচেয়ে সরব, সেই বিজেপিও আজ পর্যন্ত জানাতে পারেনি এসআইআরের মাধ্যমে কতজন বাংলাদেশিকে শনাক্ত করা গেছে। অথচ ইতিমধ্যেই এসআইআর সম্পন্ন হয়েছে বিহার, আসাম, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে, যেখানে বিজেপির রাজনীতি প্রধানত ‘অনুপ্রবেশ নির্ভর’।

নির্বাচন কমিশন নীরব থাকলেও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো ‘ঘুসপেটিয়া’ নিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণে রাশ টানেননি। এসআইআরের মাধ্যমে ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও জেন-জি যে আন্দোলন চালাচ্ছে, বিজেপি তার সমালোচনায় তুলে আনছে সেই ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্ব।

দুই সপ্তাহ আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই আন্দোলনের বিরোধিতা করে প্রকাশ্য সভায় বলেছিলেন, কংগ্রেস ও তার সহযোগীরা এসআইআরের বিরোধিতা করছে একটাই কারণে। তারা চায়, অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার তালিকায় রেখে তাদের সমর্থনে ভোটে জিততে। ঘুসপেটিয়ারাই কংগ্রেসিদের ভোটব্যাংক।

সিইসি জ্ঞানেশের ওপর চাপ বাড়ছে

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নাম করে সেই জনসভায় অমিত শাহ বলেছিলেন, দেশবাসী ওদের এই উদ্দেশ্য বুঝে গেছে। তাই তাঁরা আর বিভ্রান্ত হবে না।

কর্ণাটকের এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বহু অভিযোগ উঠেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বারবার বলা হয়েছে, কমিশনের সহযোগিতায় সন্দেহভাজন ভোটারদের নাম বাদ দিতে হাজার হাজার ‘ফর্ম ৭’ ছাপিয়ে তারা দলীয় কর্মীদের কাছে বিলি করেছে। বিজেপি সংগঠিতভাবে তাতে বেছে বেছে নাম তুলেছে প্রধানত সংখ্যালঘু ভোটারদের, যাতে সেই নাম তালিকা থেকে বাদ যায়। পাশাপাশি বিজেপিবিরোধী ভোটারদেরও চিহ্নিত করে সেই ফর্মে নাম তোলা হয়েছে।

এসব অভিযোগ সত্ত্বেও দেখা গেল চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় কাটা গেছে মোট ৯৯ লাখ ৩২ হাজার ৩০৩ জনের নাম। এসআইআরের আগে রাজ্যের ভোটারের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৩২ হাজার ৩১৪ জন, নিবিড় সংশোধনের পর তা কমে হয়েছে ৪ কোটি ৫৫ লাখ ১১। অর্থাৎ আগের তুলনায় ভোটার কমেছে ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেসশাসিত কর্ণাটক এখনো পর্যন্ত দেশে দ্বিতীয়। প্রথম পাঁচ রাজ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশ। সেখানে ভোটার কমেছে ২২ শতাংশ। দ্বিতীয় কর্ণাটক, ভোটার কমার হার প্রায় ১৮ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে আছে গুজরাট ও উত্তর প্রদেশ। দুই রাজ্যেই ভোটার কমেছে ১৩ শতাংশ করে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে ছত্তিশগড় (১২ শতাংশ)।

কর্ণাটকে কমে যাওয়া প্রায় ১ কোটি ভোটারের মধ্যে ‘মৃত’ বলে যাঁরা চিহ্নিত, তাঁদের সংখ্যা মাত্র ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৪। একাধিক কেন্দ্রে নাম আছে এমন ৭ লাখ ৯ হাজার ৮৭০ জনকে পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ‘স্থানান্তরিত’ ভোটারের সংখ্যা, ৬৫ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭৯।

এরপরেই রয়েছে ‘অনুপস্থিত’ ভোটাররা। সংখ্যাটা ১৯ লাখ ৯২৬। বিরোধীদের মূল আপত্তি এই ‘স্থানান্তরিত’ ও ‘অনুপস্থিত’ সংখ্যার পাশাপাশি ফর্ম ৭-এর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নাম কাটা নিয়ে। তাদের বক্তব্য, স্থানান্তরিত ভোটাররা নিশ্চিতই অন্য কোনো না কোনো রাজ্যের ভোটার হবেন। সে ক্ষেত্রে দেশের মোট ভোটার এভাবে কোটি কোটি কমে যায় কী করে? বিজেপির ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্বের মতো এ-ও এক বিস্ময়।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের ৭০ শতাংশ মুসলিম: সমীক্ষার তথ্য