দেশে খোলাবাজারে তথা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন ভারতীয় মুদ্রা রুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটনসহ নানামাত্রিক সম্পর্কের কারণে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গ্রাহকদের বেশি পরিমাণে রুপি লেনদেন করতে হয়। তবে সংখ্যার দিক থেকে ভারতীয় রুপির লেনদেন এগিয়ে থাকলেও প্রকৃত আর্থিক মূল্যে এখনো মার্কিন ডলারের আধিপত্য অনেক বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএসের তালিকায় থাকা ২৬৮টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৬টির তথ্য নিয়ে করা এই সমীক্ষায় ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিবিএসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের খোলাবাজারে মোটামুটি ২৪ ধরনের মুদ্রার লেনদেন হয়ে থাকে। এর মধ্যে ভারতীয় রুপি সর্বাধিক পরিমাণে লেনদেন বা হাতবদল হয়। যেমন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ৭ কোটি ৭০ লাখ রুপি লেনদেন হয়েছিল। একই সময়ে ৩ কোটি ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লেনদেন হয়েছে ভারতীয় রুপির। কিন্তু বাজারমূল্য ও মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আয় বা লেনদেনের আর্থিক মূল্যের দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মার্কিন ডলার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ মার্কিন ডলার কিনতে খরচ হতো ১১০ থেকে ১২৩ টাকা। আর ১ ভারতীয় রুপি পাওয়া যেত মাত্র ১ টাকা ৩৩ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সায়। অর্থাৎ তখন টাকার বিপরীতে ১ মার্কিন ডলারের মান ছিল ১ ভারতীয় রুপির চেয়ে প্রায় ৮৫ গুণ বেশি।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্যের পাশাপাশি চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত রয়েছে। এ কারণে ভারতীয় মুদ্রা রুপির চাহিদা অনেক বেশি। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারও ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গেও গ্রাহকেরা মার্কিন ডলার বেশি লেনদেন করেন। সে জন্য দেশের খুচরা মুদ্রাবাজার মার্কিন ডলারের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। অর্থাৎ মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের মূল উৎস হয়ে উঠেছে মার্কিন ডলার।

* মানি চেঞ্জারদের মোট আয়ের ৮৯% আসে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় থেকে।* ডলার লেনদেনে ৮ কোটি, ভারতীয় রুপি থেকে ২৯ লাখ টাকা মুনাফা মানি চেঞ্জারদের।* হজ, ওমরাহ ও গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে বাড়তি কর্মী নিয়োগ দেয় মানি চেঞ্জাররা।

দেশীয় মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুদ্রা লেনদেনের সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরবের রিয়াল। এরপর রয়েছে যথাক্রমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা ইউরো, মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, থাই বাথ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দিরহাম, কাতারের রিয়াল, সিঙ্গাপুরের ডলার ও কানাডীয় ডলার।

টাকার বিপরীতে এসব বিদেশি মুদ্রার লেনদেনের শীর্ষে রয়েছে মার্কিন ডলার। বিবিএস যে ৯৬টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের ওপর সমীক্ষা চালিয়েছিল, সেগুলোর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডলার বিক্রি করে ৪২০ কোটি টাকা আয় হয়েছিল। একই অর্থবছরে তারা মোট ৪১২ কোটি টাকার ডলার কিনেছিল। খোলাবাজারে মূল্যমানের দিক থেকে মুদ্রা লেনদেনে দ্বিতীয় ছিল ইউরো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৬ কোটি টাকার ইউরো বিক্রি করেছিল মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো। মূল্যমানের এই তালিকায় এরপর রয়েছে সৌদি রিয়াল, ভারতীয় রুপি, মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত ও সিঙ্গাপুরি ডলার।

আয়ের মূল উৎস মার্কিন ডলার

মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের তিনটি খাত হলো মুদ্রা বিনিময়, পাসপোর্টের বিপরীতে এনডোর্সমেন্ট ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজ। এর মধ্যে মুদ্রা বিনিময় করেই তারা ৮৯ শতাংশ আয় করে থাকে। সাধারণত প্রতিষ্ঠানগুলো যে মূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা কেনে, তার চেয়ে কিছুটা বাড়তি দামে তা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। এই বাড়তি আয় বা ট্রেড মার্জিনই হলো এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বা আয়ের মূল উৎস।

বিবিএসের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচায় মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জিত মুনাফার সিংহভাগই এসেছে মার্কিন ডলার লেনদেন থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানগুলো ডলার লেনদেনের মাধ্যমে ৮ কোটি টাকা মুনাফা করে। ইউরো লেনদেন করে ১ কোটি টাকা, আর ভারতীয় রুপি লেনদেনে ২৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। তাই মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয় ও মুনাফার জন্য মার্কিন ডলারের ওপরেই বেশি জোর দেয়।

বিবিএসের সমীক্ষায় অবশ্য মানি এক্সচেঞ্জ খাতের মোট কর্মী সংখ্যার উল্লেখ নেই। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সমীক্ষা করা ৯৬টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৪০০ কর্মী কাজ করেছেন বলে জানানো হয়। দেখা গেছে, বছরের বিভিন্ন প্রান্তিকে অস্থায়ী কর্মী সংখ্যা ওঠানামা করে। সবচেয়ে বেশি কর্মী ছিল চতুর্থ প্রান্তিকে বা এপ্রিল থেকে জুন মাসের দিকে। বিবিএস বলেছে, সাধারণত পবিত্র হজ পালন, ওমরাহ ও গ্রীষ্মকালীন বিদেশ ভ্রমণের সময়ে বাড়তি গ্রাহকের চাপ সামলাতে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত খণ্ডকালীন জনবল নিয়োগ দেয়।

বিবিএসের সমীক্ষায় এই খাতের মালিকানা কাঠামোর একটি চিত্র পাওয়া যায়। সমীক্ষা করা ৯৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৫টি সম্পূর্ণ একক ব্যক্তির মালিকানাধীন। যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৪ ও প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ১৬। অর্থাৎ দেশের খুচরা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বাজারের সিংহভাগ মূলত অনানুষ্ঠানিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের উদ্যোক্তাদের দ্বারা পরিচালিত।