রাশিয়া গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে শত শত ড্রোন ও কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ৯১ জন। পাশাপাশি প্রায় ১৩০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরে কিয়েভে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রাতভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে কিয়েভের কেন্দ্রস্থল। বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। হাজার হাজার বাসিন্দা জীবন বাঁচাতে বোমা আশ্রয়কেন্দ্র ও ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনে ছুটে যান। শহরের আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো টেলিগ্রামে জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজনের মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৯১ জন। এর আগে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা কাজ চালিয়ে যাওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তকাচেঙ্কো বলেন, রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে দিনিপ্রো নদীর বাম তীরের একটি এলাকায় উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে পাঁচ মরদেহ উদ্ধার করেছেন। সেখানে এখনো আটজন বাসিন্দার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি লেখেন, ‘ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি সরানো না পর্যন্ত উদ্ধারকর্মীরা বিরতিহীনভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আরও নিহত ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যেতে পারে।’
যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়ালেও রাজধানীজুড়ে এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ধ্বংসযজ্ঞের নজির খুব কমই রয়েছে। এর আগে মে মাসে কিয়েভে এক হামলায় ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আয়ারল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন। তিনি একটি নয়তলা আবাসিক ভবন পরিদর্শন করেন, যার অর্ধেক অংশ হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য আংশিকভাবে মিত্র দেশগুলোর প্রতিশ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সময়মতো সরবরাহে ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। ক্লান্ত ও হতাশ দেখাচ্ছিল জেলেনস্কিকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অংশীদাররা যদি সময়মতো তাঁদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেন, তাহলে আজ হয়তো আরও অনেক বাড়িঘর ও মানুষের জীবন রক্ষা করা যেত। আমরা আমাদের অংশীদারদের কাছে শুধু চাই, তাঁরা যেটুকু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটুকুই যেন বাস্তবায়ন করেন। আমরা অতিরিক্ত কিছু চাইছি না।’
পরে রাতে দেওয়া ভিডিও ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, আগামী সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্য যদি ন্যাটো এখনো মিত্রদের কাছে কোনো অর্থ বহন করে। ইউরোপের এমন নিজস্ব সক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ সব ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।’
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়া ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৯৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। বিমান বাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি এবং সেগুলো প্রতিহত করার হার ছিল কম। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে ভুগছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে জানায়, দূরপাল্লার উচ্চ-নির্ভুলতাসম্পন্ন আকাশ, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক অস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে চালানো ‘ব্যাপক হামলায়’ কিয়েভ ও অন্যান্য স্থানের সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা, পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে। মস্কোর দাবি, রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে কিয়েভ। তারা দাবি করেছে, রাতেই রাশিয়ার নিজনি নোভগোরোদ অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালানো হয়েছে। ওই অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, একটি শিল্প স্থাপনায় হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, রুশ সামরিক কমান্ডাররা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হামলার বিষয়ে অবহিত করেছেন। একই সঙ্গে মস্কো তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে সামরিক চাপ আরও বাড়াবে বলেও জানানো হয়েছে।








