কুড়িগ্রামে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ধরলা ও তিস্তায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে একের পর এক বসতি ও ফসলি জমি। নদীতীরে ফেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জিও ব্যাগও নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে আতঙ্কে রয়েছেন নদীতীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দারা।

ভাঙন হুমকিতে থাকা তীরবর্তী বাসিন্দাদের সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে পাউবো। বিশেষ করে ভাঙন অব্যাহত থাকলে রাতে নদীতীরবর্তী স্থানে না থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে তীরের ভূমিতে ফাটল থাকলে সেই স্থান এড়িয়ে চলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি মৌজায় তিস্তা তীরে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। এতে ওই গ্রামের অটোরিকশাচালক শহিদুল ইসলাম, কৃষি শ্রমিক ইদ্রিস আলী ও কৃষক আতাউল হকের বসতভিটার বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়। তীর রক্ষায় পাউবোর ফেলা জিও ব্যাগসহ ভিটামাটি ও কৃষিজমির অংশ নদীগর্ভে চলে যায়। আতঙ্কে তড়িঘড়ি করে ঘরের টিন, আসবাবপত্র সরিয়ে নেন ভাঙনকবলিত লোকজন।

ভাঙনের শিকার কৃষক আতাউল বলেন, ‘বাড়ি থাকি ২০ হাত দূরত ছিল নদী। সকালে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। গাছপালা, আবাদি জমি টানতে থাকে। বস্তাও (বালু ভর্তি জিও ব্যাগ) টানি নিয়া গেইছে। ঘর নিয়া যাবার ধরছে। শ্যাষত একটা ঘর সরে নিছি। আরও দুজনের ভিটা ভাঙছে। পরে নদী একটু শান্ত হইছে। এখনো ১০ ঘর ভাঙনের হুমকিত আছে। ভাঙন না ঠেকাইলে সউগ যাইবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা জাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘তীর রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। কিন্তু কাজের ধীরগতির কারণে সুফল মিলছে না। এখনো হাজার হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা বাকি আছে। ভাঙন হওয়ার পর ব্যাগ ফেললে স্থানীয়দের বসতি, সম্পদ কীভাবে রক্ষা হবে! সময়মতো ডাম্পিং শেষ করতে না পারলে এলাকাবাসীর বড় ক্ষতি হবে।’

পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার চর গোরকমন্ডলে ধরলা নদীর তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কয়েক দিনের ভাঙনে অন্তত চারটি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে অর্ধশত পরিবার ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।

ভাঙনের মুখে থাকা গোরকমন্ডল গ্রামের দিনমজুর মজনু সরকার (৪৮) বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। কয়েকবার ভাঙনের শিকার এই দিনমজুর ভিটা রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

মজনু বলেন, ‘এই বয়সে পাঁচ-ছয়বার ভাঙনের শিকার হইছি। জমিজমা সউগ নদী গিলি খাইছে। এবার ফের ভিটা হারবার বসছি। বাধ্য হয়া ঘরবাড়ি সরে নিবার লাগছি। পরিবার নিয়া কেমন করি বাঁচমো সেটাই এখন বড় দুশ্চিন্তা।’

মজনুর স্ত্রী চাঁনবানু বলেন, ‘রাইত নামলে ভয় বাড়ে। কখন যে ভাঙন আসি ঘরটা নিয়া যায়, সেই ভয়ে ঘুমও ধরে না। হামার খোঁজখবর নেওয়ার কাইয়ো নাই। ভিটাটা রক্ষা করার জন্য কার কাছত যাই!’

স্থানীয় ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘মজনু-চাঁনবানু দম্পতির মতো কয়েকটি পরিবার এরই মধ্যে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গত এক বছরে অনেক পরিবার নদীগর্ভে ভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নিলে আরও পরিবার নিঃস্ব হবে, ভূমিহীন ও গরিবের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।’

পাউবো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, রাজারহাটের রামহরি এলাকায় তিস্তা তীরে দুই হাজার ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। ভাঙনের তীব্রতায় সেগুলো টিকে নাই। গোরকমন্ডলেও দুই হাজার ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। উভয় স্থানের জন্য পৃথকভাবে ছয় হাজার করে জিও ব্যাগের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। কাল থেকে তিস্তা তীরে ব্যাগ ফেলা শুরু হবে। ধরলা তীরেও দ্রুত ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’