দিনাজপুরের লিচু স্বাদ, ঘ্রাণ ও উৎপাদনে দেশসেরা হিসেবে পরিচিত। প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এ ঐতিহ্য এখন জেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। চলতি মৌসুমে ৫ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করে ৩৬ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮শ কোটি টাকা। অথচ ‘লিচুর রাজ্য’ খ্যাত এই জেলাসহ দেশের কোনো জায়গায় নেই লিচু গবেষণা কেন্দ্র।

স্থানীয়রা জানান, দিনাজপুরে বেদানা, হারিয়ানা বেদানা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাঁঠালি, মোজাফরি, গোলাপ খাস, কদমী চায়না-৩, চায়না-২ সহ ১১ জাতের লিচু চাষ হয়ে থাকে। তবে এরমধ্যে বেদানা লিচু ভৗগলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি লাভ করেছে। এরপরেও এই জেলায় এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো লিচু গবেষণা কেন্দ্র।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, দিনাজপুর হটিকালচার সেন্টার, দিনাজপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ও দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) খবর নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নেয়ামত নগরে ১৯৮৫ সালে আম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু লিচু নিয়ে গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আলাদা পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র বা ইনস্টিটিউট নেই।

‘দিনাজপুরের লিচুর স্বাদ, ঘ্রাণ ও মান অনন্য। গবেষণায় জানা গেছে মাটিতে মাইক্রোবিয়াল অণুজীবের উপস্থিতি নাইট্রোজেন সংবন্ধনের ফলে লিচুর মিষ্টতা, রসালো স্বাদ ও ঘ্রাণে প্রভাব সৃষ্টি করে।’

লিচু সংক্রান্ত যাবতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-এর অধীনে পরিচালিত হয়। কিন্তু লিচু নিয়ে কোনো গবেষণা চালু রয়েছে কি না এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেনি।

লিচু নিয়ে দেশে নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্রহর্টিকালচার সেন্টার/ ছবি: জাগো নিউজ

এ বিষয়ে দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বে থাকা তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) আনিছুজ্জামান জানান, গবেষণা বিষয়ে কোনো তথ্য তার জানা নেই।

দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. এজামুল হক বলেন, আবহাওয়া সহিষ্ণু লিচুর জাত উদ্ভাবনে সুনির্দিষ্ট গবেষণা নেই। কিন্তু যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে তাতে করে আগামী দিনে লিচু চাষ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই লিচু নিয়ে গবেষণা জরুরি।

আরও পড়ুন

বোম্বাই লিচুতে বাজার মাত, রাজশাহীতে ৫৬ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা

তিনি বলেন, দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টার আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের উন্নত মানের চারা উৎপাদন ও বিপণন করে থাকে। এখানে গবেষণার কোনো সুযোগ নেই।

‘হিমালয়ের অববাহিকা এবং জলবায়ুগত প্রভাব লিচু উৎপাদনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। দিনাজপুরে লিচুর অর্থনীতির সঙ্গে মধু মাস জৈষ্ঠ্যে পুষ্টি চাহিদায় জোগানে একটি বিশাল ক্ষেত্র। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন, প্রক্রিয়াজাত করণ এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজন গবেষণা, উদ্ভাবন এবং লিচুর জাত উন্নয়ন।’

দিনাজপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র কোনো জাত উদ্ভাবন করে না। সাধারণত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত নতুন জাতগুলো এ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়।

দিনাজপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ শামসুল হুদা বলেন, আমাদের হেড অফিসে ফল নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। জেলায় এর কোনো সুযোগ নেই। দিনাজপুরে কেউ গবেষণা করছে এমন তথ্যও আমাদের কাছে নেই।

লিচু নিয়ে দেশে নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্র

জানা গেছে, দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ কীটনাশকমুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প খরচে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ লিচু উৎপাদনে সফলতা পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। অন্যান্য ফলের মতো প্রথমবার লিচুতেও ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করে নিরাপদ ফল উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।

হাবিপ্রবির গবেষক দলের সদস্য শিক্ষার্থী রাইয়ান মোহাম্মদ সাদ বলেন, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে এই গবেষণা সম্পন্ন হলেও এটি কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

কেজিতে বিক্রি হচ্ছে লিচু, লাভ নাকি ক্ষতি

গবেষক দলের প্রধান হাবিপ্রবির কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ড. আব্দুল আলিম জানান, তিন বছরের গবেষণার পর অন্য ফলের মতো প্রথমবার লিচুতেও ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করে নিরাপদ ফল উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। চাষিরা পোকার আক্রমণ থেকে লিচুকে বাঁচাতে অসংখ্যবার কীটনাশক এবং অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ স্ট্রে করেন, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এবং এতে চাষিদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। তাই কীটনাশক খরচ কমার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে এই পদ্ধতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

‘আবহাওয়া সহিষ্ণু লিচুর জাত উদ্ভাবনে সুনির্দিষ্ট গবেষণা নেই। কিন্তু যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে তাতে করে আগামী দিনে লিচু চাষ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই লিচু নিয়ে গবেষণা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, স্বল্প খরচেই উৎপাদিত এই লিচু বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। এই গবেষণায় লিচুর প্রথম দিকে জৈব বালাইনাশকের এবং পরবর্তীতে ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। যে কারণে এই ফল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য।

জানা গেছে, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় প্রফেসর ড. আব্দুল আলিমের নেতৃত্বে হাবিপ্রবির পিএইচডি ও মাস্টার্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই গবেষণাটি পরিচালনা করছেন।

লিচু সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে ৩৮তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উপলক্ষে ২০১৭ সালে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত তরুণ গবেষক ও উদ্যোক্তা মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, এ অঞ্চলের লিচুর স্বাদ, ঘ্রাণ ও মান অনন্য। গবেষণায় জানা গেছে মাটিতে মাইক্রোবিয়াল অণুজীবের উপস্থিতি নাইট্রোজেন সংবন্ধনের ফলে লিচুর মিষ্টতা, রসালো স্বাদ ও ঘ্রাণে প্রভাব সৃষ্টি করে।

লিচু নিয়ে দেশে নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্র

তিনি আরও বলেন, হিমালয়ের অববাহিকা এবং জলবায়ুগত প্রভাব লিচু উৎপাদনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। দিনাজপুরে লিচুর অর্থনীতির সঙ্গে মধু মাস জৈষ্ঠ্যে পুষ্টি চাহিদায় জোগানে একটি বিশাল ক্ষেত্র। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন, প্রক্রিয়াজাত করণ এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজন গবেষণা, উদ্ভাবন এবং লিচুর জাত উন্নয়ন।

আরও পড়ুন

আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে বইয়মে লিচু সংরক্ষণ করে ৩৮তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। ৬ মাস পর্যন্ত লিচুর গুণগতমান, রঙ নষ্ট হয়নি। সেই সময় সংরক্ষণ করা লিচুগুলো এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। নষ্ট হয়নি। এটি খাওয়ার উপযুক্ত কিনা তা বিসিএসআইআর ল্যাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে দিনাজপুরে লিচু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, লিচুর উন্নত জাত, লিচু সংরক্ষণ, আবহাওয়া সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। গবেষার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

এনএইচআর/এএসএম