নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, পুলিশকে আরও জনবান্ধব ও গণতান্ত্রিক বাহিনীতে রূপান্তরে ২০০৫ সালে শুরু হয়েছিল পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম (পিআরপি)। এই প্রকল্পের আওতায় ধাপে ধাপে থানাগুলোকে মডেল থানায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক বছর পরই তা কার্যত থেমে যায়।
মডেল থানাগুলো এখন কেবল কাগজ-কলম ও সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সেগুলোও সাধারণ থানার মতোই জনবল, আবাসন ও লজিস্টিক সংকটে পরিচালিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), ডিএফআইডি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তায় বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে এই প্রকল্পে কমিউনিটি পুলিশিং, মানবাধিকার, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, তদন্ত সক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মডেল থানা গড়ে তোলার মতো উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানেই বন্ধ হয়ে যায় সবকিছু। ফলে এখন কাগজে-কলমে মডেল থানা থাকলেও এর কোনো ছোঁয়া নেই থানাগুলোতে। বরং জনবল-বাসস্থানসহ বিভিন্ন সংকটের মধ্যে চলছে থানাগুলো।
খোদ পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, বর্তমানে থানাগুলো কাগজে-কলমে আর সাইনবোর্ডের নামে মডেল থানা হলেও প্রয়োজনীয় যে সাপোর্ট থাকা দরকার ছিল তা তো থাকছেই না; বরং সাধারণ থানা হিসেবেও রয়েছে জনবল সংকট, সদস্যদের থাকার স্থান সংকুলানসহ নানা অসুবিধা।
আরও পড়ুন
পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৩৩ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর
পুলিশ ফোনবুক অ্যাপের তথ্য বলছে, রাজধানীতে মোট ৪টি মডেল থানা রয়েছে। এগুলো হলো- রমনা মডেল থানা, পল্টন মডেল থানা, উত্তরা মডেল থানা ও মিরপুর মডেল থানা। তবে অ্যাপে সাধারণ থানার তালিকায় চকবাজার থানা উল্লেখ থাকলেও এই থানা মূলত চকবাজার মডেল থানা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের তথ্যমতে, ডিএমপির আওতাধীন পাঁচটি মডেল থানা রয়েছে। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, সারাদেশে ক্যাটাগরির ভিত্তিতে প্রায় ৮৩টি থানার প্রকল্প চলছিল।
মডেল থানার প্রসঙ্গটা ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকার আসার পর পিআরপি নামের একটা প্রজেক্ট এসেছিল। ওই প্রজেক্টের আওতায় দেশে কতগুলো মডেল থানা তৈরি হয়েছিল। মডেল থানাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত কিছু কাজ হবে।- মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান।
সরেজমিনে রাজধানীর মিরপুর ও রমনা মডেল থানা ঘুরে দেখা যায়, মিরপুর মডেল থানার স্থাপনায় উন্নয়নের চিত্র লক্ষণীয়। তবে থানার কার্যক্রম ও সামগ্রিক চিত্রে মডেল থানা হিসেবে সাধারণ থানা থেকে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। থানার কার্যক্রম ও যানবাহন ব্যবস্থাসহ যেসব ব্যতিক্রম থাকার কথা তেমন কোনো পরিবর্তনের চিত্র ছিল না থানাজুড়ে।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, মডেল থানার প্রসঙ্গটা ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকার আসার পর পিআরপি নামের একটা প্রজেক্ট এসেছিল। ওই প্রজেক্টের আওতায় দেশে কতগুলো মডেল থানা তৈরি হয়েছিল। মডেল থানাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত কিছু কাজ হবে।
আরও পড়ুন
পুলিশে বড় রদবদল
তিনি জানান, প্রত্যেক মডেল থানায় পিআরপি প্রজেক্ট থেকে সাদা রঙের পিকাপ আর মোটরসাইকেল দেওয়া হয়েছিল। পিআরপি থেকে প্রত্যেক বছর থানার কাগজ-কলমের টাকা দেওয়া হতো। প্রজেক্টের পর ২০০৭ সাল থেকে এটি চালু হয়েছিল। মোটরসাইকেলগুলো আমরা চালিয়েছি। ৫/৭ বছর পর সেই প্রজেক্ট মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই সময় পিআরপি থেকে বিভিন্ন দেশে পুলিশ অফিসারদের ট্রেনিংও দেওয়া হয়েছিল। এর পর ওই মডেল থানাগুলোর মডেল নাম শুধু কাগজ কলমে আছে, বাস্তবে আর কিছুই নেই।
এখন ওই মডেল থানাগুলোতে আলাদা কিছু নেই। তখন ডেস্ক তৈরি করা হয়েছিল। এখন সেগুলো নেই। দুইটা ইউনিট তৈরি করছিল, একটা তদন্ত ইউনিট, একটা অপারেশন ইউনিট। সেগুলো এখন কাগজ-কলমেও নেই এবং বাস্তবেও নেই। এখন সব থানা একই, মডেল বলে কোনো কিছু নেই।

রাজধানীর রমনা মডেল থানায় সরেজমিনে দেখা যায়, এই থানার সামনে দাঁড়ালে প্রথম দেখায় এটি যে একটি থানা, তা সহজে বুঝারই উপায় নেই। ব্যস্ত সড়কের পাশেই দেয়ালঘেঁষা ভাড়া করা ভবনটি বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা সাধারণ একটি আবাসিক ভবনের মতো। থানার পরিচয় বহনকারী সাইনবোর্ড ছাড়া ভবনটির বাহ্যিক অবয়বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির তেমন কোনো ছাপই চোখে পড়ে না।
থানার ভেতরে প্রবেশ করতেই বদলে যায় দৃশ্য। প্রবেশমুখের এক পাশে ডিউটি অফিসারের কক্ষ, অন্য পাশে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষ। মাঝখানের সরু করিডোর ধরে এগোলে পর্যায়ক্রমে দেখা মেলে তদন্ত, প্রশাসন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন কক্ষের। জায়গার স্বল্পতার কারণে কক্ষগুলো তুলনামূলক ছোট এবং চলাচলের পথও সংকীর্ণ। থানায় সেবা নিতে আসা মানুষ, পুলিশ সদস্য এবং বিভিন্ন কাজে আগতদের একই করিডোর ব্যবহার করতে হওয়ায় ব্যস্ত সময়ে সেখানে কিছুটা ভিড়ের চিত্রও চোখে পড়ে।
আরও পড়ুন
হাঁটু পানিতে ডুবে আছে মডেল থানা
থানার নিজস্ব গাড়ি রাখার ব্যবস্থাও নেই। থানার প্রধান ফটকের সামনের অর্ধেক রাস্তা বন্ধ রেখে একটি গাড়ি ও প্রধান সড়কের ওপরে দুটি গাড়ি থাকতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে রমনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাহাত খান বলেন, মডেল থানা আসলে একটা প্রজেক্ট ছিল। পরে প্রজেক্টটি বাদ হয়ে যায়। সেসময় প্রত্যেক মডেল থানাতে একজন করে সার্কেল এসপি বসতেন। প্রজেক্ট চলমান প্রেক্ষাপটে মডেল থানাগুলো লজিস্টিক বা যে সাপোর্টগুলো প্রয়োজন এগুলো যাতে বেশি পায় এবং পুলিশিংটাও যাতে মডেল করতে পারে সেভাবে কাজ হতো।
এর আগে পিআরপি প্রকল্পের আওতায় একটি প্রজেক্ট ছিল। বিভিন্ন জায়গায় মডেল থানা করে একজন করে এএসপি নিয়োগ দিয়ে মডেল থানা চালানোর প্রজেক্ট ছিল। যেহেতু প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে এবং আইনেও মডেল থানা বলে সেভাবে কিছু বলা নেই। সেহেতু মডেল থানা বলে আলাদাভাবে কোনো বিবেচনা নেই।- পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন
এখন ঢাকা শহরে আসলে সে রকম ডিসক্রিমিনেশন করার সুযোগ নেই। সব পুলিশ স্টেশনেই সার্ভিস দিতে হয়। লাইক এজ মডেল পুলিশ স্টেশন।
মডেল থানা হয়েও রমনা থানার স্বচিত্র পরিস্থিতি তুলে ধরে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের থানাটি আসলে একটি কমপ্লেক্স। আসলে আমাদের এটা ভাড়া ভবন, তাই জায়গার স্বল্পতা।
তিনি বলেন, আমাদের পুরোনো থানায় ইমিডিয়েট একটি বিল্ডিং হচ্ছে। শিগগির হয়ে যাবে। যতদূর জানি চলতি বছরের ডিসেম্বরে হয়ে যাওয়ার কথা।
আরও পড়ুন
একটি হত্যা, শ্বাসরুদ্ধকর জবানবন্দি ও একটি মৃত্যু
এদিকে মিরপুর মডেল থানা ও রমনা মডেল থানায় দায়িত্বরত সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তাদের ভাষ্য, রমনা থানায় মোট জনবল বরাদ্দ রয়েছেন ১৭৩ জন। এর বাইরেও পিএমও ফোর্স থাকে। থানার ১২ জন ড্রাইভারসহ সব মিলিয়ে ২৫০ জনের মতো থাকেন এই থানায়।
ব্যারাকের অবস্থা যাচ্ছেতাই বলেও অভিযোগ তাদের। যেখানে ৫ জন থাকার ব্যবস্থা সেখানে ১০ জনকে থাকতে হচ্ছে। থানাটি নামে মডেল থানা হলেও জনবল থাকার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এর আগে পিআরপি প্রকল্পের আওতায় একটি প্রজেক্ট ছিল। বিভিন্ন জায়গায় মডেল থানা করে একজন করে এএসপি নিয়োগ দিয়ে মডেল থানা চালানোর প্রজেক্ট ছিল। যেহেতু প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে এবং আইনেও মডেল থানা বলে সেভাবে কিছু বলা নেই। সেহেতু মডেল থানা বলে আলাদাভাবে কোনো বিবেচনা নেই।

তিনি বলেন, তবে সেই সময় পিআরপির ৮টি এবং জাইকার ৭৫টিসহ সব মিলে সারাদেশে ৮৩টি থানা মডেল থানা করার জন্য প্রকল্প চলেছিল। এই ৮৩টি থানার মধ্যেও আবার ক্যাটাগরি ছিল।
এখন মডেল থানা বলে কিছু নেই জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের কাজের অগ্রাধিকার আমরা বিভিন্ন থানার ক্যাটাগরি করে গুরুত্ব অনুযায়ী সেভাবে কাজ করছি। কিন্তু মডেল থানা হিসেবে আলাদা কোনো কিছু নেই।
কেআর/এমআইএইচএস








