ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে কমিয়ে দেওয়া বা সরিয়ে নেওয়া মার্কিন কূটনীতিকদের আবার দূতাবাস ও কনস্যুলেটে পাঠানো শুরু করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরানের সঙ্গে আবার বড় ধরনের যুদ্ধ বা তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হবে বলে মনে করছে না। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিপুলসংখ্যক মার্কিন কূটনীতিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

গত মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিদেশি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ‘এই মুহূর্তে’ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলা শুরু করবে না। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তাদের ও তাদের পরিবারের কয়েক মাসের অনিশ্চয়তারও অবসান হচ্ছে। এতদিন মার্কিন প্রশাসন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে আবার পূর্ণমাত্রায় জনবল নিয়োগ করবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল।

অনেক মার্কিন কূটনীতিককে তাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগে তাদের সামনে সন্তানদের কোথায় স্কুলে ভর্তি করানো হবে এবং পরিবার নিয়ে আবার মধ্যপ্রাচ্যে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

অপর মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যেসব দেশে মার্কিন দূতাবাসে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক কূটনীতিক ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইসরায়েল, লেবানন, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, ইরাক ও কুয়েত। প্রথম দফায় মার্কিন কূটনীতিকদের লেবাননে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ফেরত পাঠানো হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও লেবাননে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত জনবল রাখা হবে। অন্যদিকে ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে জনবল সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত রাখা হবে। তবে নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এরই একটি লক্ষণ হলো, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদের যাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে বিধিনিষেধ কার্যকর করবে। লেবানন ও ইরাকে কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ভ্রমণের ওপর ইতোমধ্যেই বিধিনিষেধ রয়েছে।

ইরান ও ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল। এর ফলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে তুলনামূলক ছোট দেশ কুয়েত ও বাহরাইন ইরানের হামলায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর ট্রাম্প প্রশাসন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে। পেন্টাগন বিশেষভাবে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে থাকা বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে চিন্তা করছে।

ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের দীর্ঘদিনের কৌশল নতুন করে পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে এর আগেও খবর প্রকাশিত হয়েছিল। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই জুনে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রাখার কৌশল নিয়ে ওয়াশিংটনে বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়ন প্রত্যাশিত ছিল।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতিকদের ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের সামরিক উত্তেজনা আপাতত কমার প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে কুয়েত, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা ও কূটনৈতিক উপস্থিতির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ যে এখনও গভীর, সেটিও স্পষ্ট করছে।