বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের সিংহভাগ মানুষের জীবিকা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। বছরের পর বছর ধরে উন্নত বীজ, সার, সেচ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছে পৌঁছেছে। তবে কৃষির এই সাফল্যের ছায়ায় একটি বড় সংকট দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে আছে, আর তা হলো ফলমূল ও শাকসবজির ফলন পরবর্তী ক্ষতি বা পোস্টহার্ভেস্ট লস। মাঠ থেকে ফসল তোলার পর সংরক্ষণ ও পরিবহনের অভাবে প্রতি বছর দেশে বিপুল পরিমাণ ফলমূল ও শাকসবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষতি শুধু কৃষকের পকেটে নয়, আঘাত করছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৭২ ধরনের ফল এবং ১৫৬ ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। বিশ্বের ১১৮টি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয় এবং ফল উৎপাদনে দশম। এই সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে, বাংলাদেশে ফল ও সবজির পোস্টহার্ভেস্ট ক্ষতির হার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতি তিন থেকে পাঁচ ভাগ ফসলের এক ভাগ কৃষক ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ফসলভেদে এই ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন। কাঁঠালের ক্ষেত্রে মোট ক্ষতি ৪৩.৫ শতাংশ, আনারসে ৪৩.১ শতাংশ, পেঁপেতে ৩৯.৯ শতাংশ, ফুলকপিতে ৩৪.৪ শতাংশ এবং টমেটোতে ৩২.৯ শতাংশ। এমনকি তুলনামূলকভাবে টেকসই আম ও কলায়ও এই ক্ষতির হার যথাক্রমে ২৭.৪ এবং ২৪.৬ শতাংশ। এই ক্ষতি শুধু কৃষক পর্যায়ে নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ী, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা, প্রতিটি ধাপেই ক্ষতি হচ্ছে। গড়ে হিসাব করলে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে প্রায় ৭ থেকে ৯ শতাংশ করে ক্ষতি হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, কৃষকের ফসল যখন মাঠে নষ্ট হয় বা বাজারে পানির দামে বিক্রি হয়, তখন শুধু একজন মানুষের ক্ষতি হয় না, ক্ষতি হয় একটি পরিবারের, সমাজের এবং পুরো দেশের। কোল্ড স্টোরেজে বিনিয়োগ মানে তাই শুধু প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নয়, এটি হলো মানুষের জীবনমানে, কৃষির ভবিষ্যতে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ।

এই ব্যাপক ক্ষতির কারণ কী? উত্তর লুকিয়ে আছে কয়েকটি মূল সমস্যায়। প্রথমত, ফলমূল ও শাকসবজির প্রকৃতিগত কারণ। এই পণ্যগুলোতে জলীয় অংশের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি; শসায় ৯৬ শতাংশ, টমেটোতে ৯৪ শতাংশ, বেগুনে ৯২ শতাংশ। এই উচ্চ আর্দ্রতার কারণে এগুলো দ্রুত পচতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, ফসল তোলার পর পরিচর্যার অভাব। সঠিকভাবে ও সঠিক সময়ে ফসল উত্তোলন না করা, অপরিষ্কার পাত্রে রাখা এবং রোদ বা বৃষ্টিতে উন্মুক্ত অবস্থায় পরিবহনের কারণে ক্ষতি বহুগুণে বাড়ে। তৃতীয়ত, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪০০টি কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও সেগুলো মূলত আলু সংরক্ষণের জন্য। মোট ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার এই সুবিধাগুলো ফল ও সবজির জন্য কার্যত অপ্রতুল। চতুর্থত, সংগ্রহ মৌসুমে বাজারে একসাথে বিশাল পরিমাণ পণ্য আসায় দাম পড়ে যায়, ফলে কৃষক সংরক্ষণের সুযোগ না পেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন অথবা পণ্য পচে নষ্ট হয়।

কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসল রক্ষায় কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত কার্যকর সমাধান, যেখানে সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রেখে ফলমূল ও শাকসবজি দীর্ঘ সময় ভালো রাখা সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী আম (আম্রপালি, হাড়িভাঙ্গা, লেংড়া ও বারী-৪) চুন ও গরম পানির প্রাক-ট্রিটমেন্ট শেষে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এবং ৮৫-৯৫% আর্দ্রতায় ১৪ থেকে ২১ দিন ভালো থাকে। শীতকালীন সবজি (গাজর, বাঁধাকপি, মুলা ও ফুলকপি ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৪ থেকে ৩৮ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। টমেটো ও কাঁচা মরিচ ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ২১ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। আনারস, লেবু ও আমড়া ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৭ থেকে ২৬ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ সম্ভব। এই বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারলে ফলন-পরবর্তী অপচয় ও ক্ষতি ব্যাপকভাবে কমিয়ে সারা বছর বাজারে পণ্যের স্থিতিশীল সরবরাহ বজায় রাখা সহজ হবে।

কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকের পক্ষে কি কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা নেওয়া সম্ভব? বিদ্যমান কোল্ড স্টোরেজগুলো আকারে বিশাল, ব্যয়বহুল এবং সাধারণত বড় শহর বা আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে এই সুবিধা পৌঁছায় না। এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখন ছোট আকারের, কম খরচের এবং কৃষক-উপযোগী কোল্ড স্টোরেজ তৈরিতে কাজ করছে।

নতুন উদ্ভাবনী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তিতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ২২০ ভোল্ট সাধারণ গৃহস্থালি বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো যায়, যা গ্রামাঞ্চলে সহজলভ্য। বাংলাদেশে এখন প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে এবং ২৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। ফলে এই কোল্ড স্টোরেজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়া এতে আইওটি ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের মাধ্যমে বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণের সুবিধা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা হয় যা ওজোন স্তরের ক্ষতি কমায়।

কোল্ড স্টোরেজ শুধু ফসল রক্ষা করে না, এটি বাজারব্যবস্থায় একটি বিপ্লব আনতে পারে। এখন মৌসুমের শুরুতে বাজারে অতিরিক্ত পণ্য আসার কারণে দাম হু হু করে পড়ে যায়। কৃষকের উৎপাদন খরচও উঠে না। কিন্তু যদি ফসল সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, তাহলে কৃষক ফলন মৌসুমে উৎপাদন করে সেটি সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন এবং চাহিদা বেশি ও দাম ভালো এমন সময়ে বাজারে ছাড়তে পারবেন। এতে তার আয় বাড়বে, ক্ষতি কমবে। বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা চালু হলে কৃষকের আয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

একই সাথে এই উদ্যোগ নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ তৈরি করে। ছোট কোল্ড স্টোরেজ ইউনিট একজন তরুণ উদ্যোক্তা কিনে কৃষকদের কাছ থেকে ফি নিয়ে সংরক্ষণ সেবা দিতে পারেন। এতে একদিকে কৃষক লাভবান হন, অন্যদিকে একজন গ্রামীণ তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এই মডেল সরকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতির সাথেও সংগতিপূর্ণ।

দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ফসলের জন্য উপযুক্ত সংরক্ষণ তাপমাত্রা ও পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছে। এই গবেষণার ফলাফলকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) যদি কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদে কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির বিস্তার বাংলাদেশের জন্য একাধিক সুফল বয়ে আনবে। পোস্টহার্ভেস্ট ক্ষতি ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হলে লক্ষ লক্ষ টন ফলমূল ও শাকসবজি বাড়তি পাওয়া যাবে। এটি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সাথে রপ্তানি বাড়বে, মূল্য সংযোজন হবে এবং কৃষির জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি পাবে।

সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৩০ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়, যার মধ্যে ফল ও সবজির ক্ষতি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, এই অপচয় রোধ করাই হবে ভবিষ্যতে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীকে টেকসইভাবে খাওয়ানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এই বার্তাটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

এই প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার জন্য শুধু কোল্ড স্টোরেজ বসানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ কোল্ড চেইন বা শীতলীকরণ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা। মাঠ থেকে ফসল তোলার পর প্রথমেই প্রি-কুলিং করা, তারপর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যানবাহনে পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজে রাখা এবং বাজারে বা রপ্তানিতে পাঠানো। এই পুরো শৃঙ্খলটি একসাথে কাজ করলেই ক্ষতি সর্বনিম্নে নামানো সম্ভব। ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার বেশ কিছু দেশ এই কোল্ড চেইন মডেল সফলভাবে বাস্তবায়ন করে কৃষিপণ্যের অপচয় অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশও এই পথে হাঁটতে পারে।

অর্থায়নের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ছোট কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক ক্ষুদ্র কৃষকের সাধ্যের বাইরে। এই ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি, কৃষি ঋণের বিশেষ প্যাকেজ, কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে যৌথ বিনিয়োগ এবং পল্লী উন্নয়ন ব্যাংক বা এনজিওদের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংক, ইফাদ ও এডিবি এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বাংলাদেশের কৃষি আধুনিকায়নে বিনিয়োগে আগ্রহী। কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো উন্নয়নকে এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

কোল্ড স্টোরেজ কোনো বিলাসিতা নয়। এটি একটি কৃষি অবকাঠামো, যা জরুরিভিত্তিতে কৃষকের কাছে পৌঁছানো দরকার। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে ছোট, সাশ্রয়ী ও কৃষক বান্ধব কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে। অত্যন্ত আশার কথা যে, কৃষি মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় ইতিমধ্যেই বিষয়টি অনুধাবন করে ২০০০ টি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তবেই মাঠের কৃষক তার শ্রমের পুরো মূল্য পাবেন, ভোক্তা পাবেন সারা বছর তাজা ও পুষ্টিকর খাবার, আর বাংলাদেশ পাবে একটি টেকসই ও লাভজনক কৃষি ব্যবস্থা।

মনে রাখতে হবে, কৃষকের ফসল যখন মাঠে নষ্ট হয় বা বাজারে পানির দামে বিক্রি হয়, তখন শুধু একজন মানুষের ক্ষতি হয় না, ক্ষতি হয় একটি পরিবারের, সমাজের এবং পুরো দেশের। কোল্ড স্টোরেজে বিনিয়োগ মানে তাই শুধু প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নয়, এটি হলো মানুষের জীবনমানে, কৃষির ভবিষ্যতে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ।

লেখক: কৃষি যান্ত্রিকীকরণ গবেষক ও পরামর্শক।

এইচআর/এএসএম