ইফরান দ্বীপ

শুনতে হয়তো বেশ সহজ শোনায়- মাত্র এক সপ্তাহে জার্মানির ভিসা! কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের যাত্রা আর মানসিক টানাপড়েন শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে। যারা ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে, তাদের সুবিধার্থেই নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা।

আমার মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন শিক্ষাবর্ষ। তাই আগের বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাঙ্ক্ষিত কোর্স খোঁজা শুরু করি। নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই সব আবেদন শেষ করে ফেলি।

জার্মানিতে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের শেষ সময় ১৫ জানুয়ারি হলেও, ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন সম্পন্ন করাটাই ছিল আমার সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্ত। এরপর শুরু হলো চাতক পাখির মতো অপেক্ষা। অবশেষে, ২৭ জানুয়ারি ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত ভর্তির অনুমতিপত্র চলে আসে।

ভর্তির অনুমতিপত্র তো এলো, এবার শুরু হলো আসল পরীক্ষা- ‘ব্লক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা। আমি একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সমন্বিত সেবা প্যাকেজটি নিয়েছিলাম, যেখানে স্বাস্থ্যবিমা, বিশেষ ব্লক অ্যাকাউন্ট এবং সাধারণ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সব একসাথে থাকে। সেখান থেকে কাগজ পাওয়ার পর, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে চূড়ান্ত ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর ফি পাঠিয়ে দিই।

কিন্তু সবচেয়ে বড় যে ধাক্কাটা খেয়েছিলাম, সেটা হলো অ্যাকাউন্টের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা এবং তা সুইডেন থেকে পাঠানো। সুইডেনে আসা এবং এসে দ্বিতীয় সেমিস্টারের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন দেওয়া পর্যন্ত এরই মধ্যে প্রায় ২৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গিয়েছিল। এরপর আবার নতুন করে প্রায় ১৭ লাখ টাকার মতো জমা রাখা! এই টাকাটা যে আমি কীভাবে জোগাড় করেছি, তা একমাত্র আমি আর আমার সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

টাকা কোনোমতে ব্যবস্থা হলো, এবার পাঠানোর পালা। সুইডেনের নর্ডিয়া ব্যাংকে আমার অ্যাকাউন্ট ছিল। সেখান থেকে এই উদ্দেশ্যে ৪০ হাজার ক্রোনা ঋণ নিয়েছিলাম। সরাসরি আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর করতে ঝামেলা হতে পারে ভেবে, টাকাটা প্রথমে আমার একটি ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে নিই এবং সেখান থেকে পাঠাই। সুইডেন থেকে প্রায় ৭ হাজার ইউরোর মতো পাঠিয়েছিলাম, আর বাকিটা বাংলাদেশ থেকে স্থানান্তর করে অ্যাকাউন্টের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি।

এদিকে এপ্রিলের ৭ তারিখ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অ্যাকাউন্টের পুরো টাকা নিশ্চিত হতে হতে এপ্রিলের ১৬ তারিখ হয়ে যায়। অ্যাকাউন্ট নিশ্চিতকরণের প্রমাণপত্র হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই কনস্যুলার সেবা পোর্টালে ভিসার জন্য আবেদন করে দিই।

এখানে প্রাথমিক পর্যালোচনার জন্য কাগজপত্র জমা দিতে হয়। আমার একটি নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কাগজ (পারসনবেভিস) নিয়ে তাদের আপত্তি থাকায় তিনবার জমা দিতে হয়েছিল, যার জন্য প্রায় এক সপ্তাহের মতো সময় নষ্ট হয়। নয়তো দুই-তিন দিনেই হয়ে যেত।

২৪ এপ্রিল প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষ হলো এবং তারা সাক্ষাৎকার বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে বললো। এখানে একটি কৌশল আছে—তারা শুধু সপ্তাহের একটি দিন (সোমবার) সাক্ষাৎকারের সময় দেয়। আমি যখন বুক করতে গেলাম, দেখি মে মাসের কোনো সময়ই খালি নেই! মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। সারাদিন ধরে খোঁজাখুঁজি করে কোনোমতে মে মাসের ১১ তারিখের একটি সময় বুক করলাম।

কিন্তু আসল অলৌকিক ঘটনাটা ঘটল ২৬ তারিখ রোববার রাত ২টায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কী যেন চিন্তা করছিলাম, হঠাৎ মাথায় ভূত চাপল—ওদের ওয়েবসাইটে ঢুকে একটু পরীক্ষা করি। ঢুকে তো আমার চোখ ছানাবড়া! দেখি পরদিন অর্থাৎ ২৭ তারিখ সোমবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের একটি সাক্ষাৎকারের সময় খালি পড়ে আছে! এক সেকেন্ডও দেরি না করে আগের বুকিং বাতিল করে এই সময়টি নিশ্চিত করে নিলাম।

২৭ এপ্রিল সোমবার, নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ মিনিট আগেই দূতাবাসে পৌঁছালাম। সাথে বায়োমেট্রিক, ছবি, আন্তর্জাতিক ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষার সনদপত্রের অনুলিপি, সাক্ষাৎকারের নিশ্চিতকরণ পত্রের প্রিন্ট আর সুইডিশ পরিচয়পত্র নিয়ে গিয়েছিলাম।

মনে মনে মারাত্মক দুটো ভয় কাজ করছিল

১. এখানকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলাম, যা এখনো শোধ করা হয়নি।

২. ক্লাস শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই (৭ এপ্রিল), অথচ আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেরিতে পৌঁছানোর কোনো অনুমতিপত্রও নিইনি।

কিন্তু দূতাবাসে গিয়ে দেখলাম ভয়ের কিচ্ছু নেই। ভেতরে গেলাম, কাগজপত্র জমা দিলাম, আঙুলের ছাপ আর ভিসা আবেদনের ফি দিলাম সবকিছু খুব সহজভাবে হয়ে গেলো।

সবচেয়ে বড় চমকটা পেলাম তার পরের দিনই। বৈদ্যুতিন মেইলে (ই-মেইল) বার্তা আসলো- ‘আপনার ভিসা মঞ্জুর করা হয়েছে!’ খুশিতে তখন আত্মহারা অবস্থা। সাথে সাথেই দূতাবাসের ঠিকানায় পাসপোর্ট সুইডিশ ডাকসেবার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলাম। কথা ছিল ওনারা ভিসার স্টিকার লাগিয়ে ওটা ডাকযোগেই আমার বাসায় ফেরত পাঠাবেন। কিন্তু ওদের ডাকসেবায় কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা হওয়ার কারণে আমাকে আবার পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য ৭ মে নতুন একটি সময় দেয়। সেদিন গিয়ে সশরীরে পাসপোর্টটা নিয়ে আসি।

এই ছিল আমার সুইডেন থেকে জার্মানির জটিল কিন্তু রোমাঞ্চকর যাত্রা। দিনশেষে সব কষ্ট, টেনশন আর সংগ্রাম সার্থক মনে হয়, যখন কাঙ্ক্ষিত পাসপোর্টটা হাতে পাওয়া যায়। যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বা যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, সবার জন্য রইল অনেক শুভকামনা!

এমআরএম