পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতা, বিলিয়নিয়ার এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রিয় তারকা- তাকে দুর্ভাগা বলা প্রথমে অদ্ভুত মনে হতে পারে; কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে অনেকেরই মনে হয়, তার সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ছিল তিনি জন্মেছিলেন লিওনেল মেসির একই যুগে।

ফুটবল ইতিহাসের বহু সময়ে রোনালদো এককভাবেই নিজের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে উঠতে পারতেন; কিন্তু ভাগ্য তাকে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যাকে অনেকেই সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করেন।

সময়ের ব্যবধানে হয়তো আরও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হবে সেই ফুটবলারকে, যিনি প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা, শারীরিক প্রস্তুতি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের নতুন মানদণ্ড তৈরি করে নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফিনিশারে পরিণত করেছেন।

স্পেনের কাছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপকে বিদায় জানালেন রোনালদো। ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনি টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন। তবে তার অবদান শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডেই সীমাবদ্ধ নয়।

রোনালদোর হাত ধরেই বিশ্ব ফুটবলে পর্তুগালের অবস্থান বদলে যায়। একসময় বড় আসরে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে বিবেচিত দলটি তার নেতৃত্বে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়। একটি জাতীয় দলের মর্যাদা বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব খুব কম ফুটবলারেরই রয়েছে।

তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে রোনালদোর পারফরম্যান্স কখনোই তার বর্ণাঢ্য ক্লাব ক্যারিয়ারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এবারও পর্তুগালের মতো তিনিও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। দলটির সামর্থ্য বিবেচনায় অনেকেই প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

কিন্তু চোট, শারীরিক সীমাবদ্ধতা, সতীর্থদের পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাব কিংবা কঠিন সময়- যে কারণই হোক, বিশ্বকাপে সেই পরিচিত, বিধ্বংসী রোনালদোকে খুব কমই দেখা গেছে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তারকাখ্যাতির সেই উজ্জ্বলতা অনেক সময়ই ম্লান হয়ে গেছে।

তবে সবকিছুই যে তার নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা নয়। যখন সুযোগ পেয়েছেন, তখনই তিনি পর্তুগালকে এনে দিয়েছেন ইতিহাসের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা-২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। অনেকের মতে, সেই অর্জনই মেসির সঙ্গে তার ঐতিহাসিক তুলনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর রোনালদো বলেছেন, ‘আমার কাছে সেই ইউরো শিরোপাই বিশ্বকাপের সমান।’ তার এই অনুভূতির মূল্যায়ন করার অধিকার একমাত্র একজন চ্যাম্পিয়নেরই আছে। কারণ রোনালদোর আগে পর্তুগালের জন্য এমন সাফল্য ছিল প্রায় কল্পনার মতো।

রোনালদোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝা যায় তিনি যাদের পাশে নিজের নাম দেখতে চেয়েছিলেন, সেই তালিকার দিকে তাকালেই- পেলে, ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসিকে দেখা যায়। এক সময় মনে হয়েছিল, সেই আসনে বসার দাবিদার হওয়ার মতো সবকিছুই তার রয়েছে।

সেই কারণেই অনেকের বিশ্বাস, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ছিল না কোনো ম্যাচ হারানো বা কোনো ট্রফি হাতছাড়া করা; বরং তিনি জন্মেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন ফুটবল বিশ্বে একই সঙ্গে আলো ছড়াচ্ছিলেন আরেক কিংবদন্তি- লিওনেল মেসি।

আরআর/আইএইচএস