প্রতিদিন ঠিক বেলা ১১টা ৪৬ মিনিটে একটি স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে উঠি। যে স্টেশনে নামতে হয়, সেখানে পৌঁছাতে লাগে মাত্র সাত মিনিট। এই সাত মিনিট বেশ নিশ্চিন্তেই কাটে। কারণ, অফিসে সময়মতো পৌঁছাতে হবে। ঠিক সময়ে মেট্রোরেল ধরতে পারলে অফিসে পৌঁছানোর সময় নিয়েও খুব একটা দুশ্চিন্তা করতে হয় না।

অথচ সড়কপথে গেলে একই দূরত্ব পাড়ি দিতে অন্তত আধা ঘণ্টা লাগত। শুধু আমার নয়, কাজ কিংবা স্কুল-কলেজের প্রয়োজনে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় এমন অনেক মানুষেরই ভরসা এখন মেট্রোরেল।

মেট্রোরেলে যাতায়াতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যানজটের চিন্তা অনেকটাই কমে যায়। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন আসে, স্টেশনগুলোও পরিচ্ছন্ন। তবে ট্রেনে উঠলেই যে সব সময় স্বস্তিতে থাকা যায়, তা নয়। কখনো দেখা যায়, ভেতরের যাত্রীরা নামার আগেই ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। কেউ পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর সেই ব্যাগের ধাক্কা লাগছে অন্য যাত্রীর গায়ে। কারও ফোনে উচ্চ শব্দে ভিডিও চলছে, কেউ আবার পাশের আসনটি ব্যাগ দিয়ে আটকে রেখেছেন। ভিড়ের মধ্যে পকেটমারের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হয়।

মেট্রোরেলে যাতায়াতের সময় এসব ঝামেলা এড়াতে নিজের সুবিধার পাশাপাশি অন্য যাত্রীদের কথাও ভাবতে হবে। কোথায় দাঁড়াতে হবে, কীভাবে ট্রেনে উঠতে হবে, কার জন্য আসন ছেড়ে দিতে হবে—এসব বিষয়ে রয়েছে কিছু নিয়মকানুন। এগুলো মেনে চললে যাত্রা হবে আরও নিরাপদ ও স্বস্তির। চলো, জেনে নেওয়া যাক মেট্রোরেলে চড়ার সময় কোন বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি।

পৃথিবীর কোথায় প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়
আগারগাঁও মেট্রো স্টেশনে যাত্রীর ব্যাগ তল্লাশি করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা

স্টেশনে প্রবেশের সময়

মেট্রোরেলে যাত্রা শুরু হয় স্টেশন থেকেই। তাই শুরুতেই শৃঙ্খলা মেনে চলা জরুরি। টিকিট কাটার জন্য কাউন্টারে কিংবা প্রবেশপথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। এমআরটি পাস থাকলেও লাইন অমান্য করে সামনে চলে যাওয়া ঠিক নয়। টিকিট সংগ্রহের পর কাউন্টারের সামনে অযথা দাঁড়িয়ে না থেকে অন্যদের সুযোগ করে দিতে হবে।

স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে হবে। নিরাপত্তাকর্মীরা তল্লাশি করতে চাইলে তাঁদের সহযোগিতা করো। স্টেশন এলাকায় ধূমপান করা যাবে না। যেখানে-সেখানে থুতু বা ময়লা ফেলাও নিষেধ। মনে রেখো, পরিচ্ছন্ন স্টেশন শুধু কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়, যাত্রী হিসেবেও এ বিষয়ে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে।

ব্লকগুলো রাস্তা বা মেট্রোস্টেশনে দেওয়া হয় একধরনের বিশেষ পথনির্দেশক হিসেবে

প্ল্যাটফর্মে কোথায় দাঁড়াবে?

ট্রেনের অপেক্ষায় প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হলুদ রেখার পেছনে থাকতে হবে। এই রেখা যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয়েছে। ট্রেন আসার সময় রেখা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। প্ল্যাটফর্মের স্ক্রিন ডোরের ওপর দিয়ে মাথা বাড়িয়ে ট্রেন দেখার চেষ্টাও করা যাবে না।

প্ল্যাটফর্মে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য বিশেষ স্পর্শকাতর পথ রয়েছে। এই পথে দাঁড়িয়ে থাকা বা জিনিসপত্র রেখে চলাচলে বাধা দেওয়া যাবে না। যাঁরা দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে চলাচলে অসুবিধায় পড়েন, তাঁদের জন্য পথটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এটি ফাঁকা রাখা জরুরি।

চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহারের সময়ও অন্যের সুবিধার কথা ভাবতে হবে। ডিএমটিসিএলের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলন্ত সিঁড়িতে বাঁ পাশে দাঁড়াতে হবে, যাতে ডান পাশ দিয়ে অন্যরা হেঁটে যেতে পারেন। তবে সিঁড়িতে ওঠানামার সময় তাড়াহুড়া করা কিংবা অন্যকে ধাক্কা দেওয়া যাবে না।

লিফট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী, অসুস্থ যাত্রী এবং কোলে শিশু নিয়ে চলাচল করছেন এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

বেশি গরমে মেট্রোরেল চলাচল কি ব্যাহত হতে পারে
মেট্রোরেলে উঠছেন যাত্রীরা। বেশির ভাগ সময় স্টেশনে ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। যাত্রীরা বলছেন, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। মতিঝিল স্টেশনে

আগে নামতে দাও, পরে ওঠো

ট্রেন স্টেশনে থামলেই দরজার সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়বে না। আগে ভেতরের যাত্রীদের নামতে দাও। তাঁরা নেমে গেলে তারপর ট্রেনে ওঠো। ওঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি বা হুড়োহুড়ি করলে অন্যদের অসুবিধা হয়, এমনকি দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানোও ঠিক নয়। এ কারণে অন্য যাত্রীদের ওঠানামায় বাধা সৃষ্টি হয়। স্বয়ংক্রিয় দরজা বন্ধ হওয়ার সময়ও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে দরজা বন্ধ হতে কোনো বাধা তৈরি না হয়। দুই কোচের মাঝখানের চলাচলের পথও ফাঁকা রাখতে হবে।

ট্রেনের ভেতরে কেমন আচরণ করবে?

ট্রেনের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকার সময় পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখলে ভিড়ের মধ্যে অন্য যাত্রীদের গায়ে ধাক্কা লাগতে পারে। তাই ভিড় থাকলে ব্যাগ পিঠ থেকে নামিয়ে হাতে বা শরীরের সামনে রাখা ভালো। ফলে অন্যদের চলাচল করতে সুবিধা হবে।

আসনে বসার সময় ব্যাগ বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পাশের আসনে রাখা যাবে না। অন্য যাত্রীদের বসার সুযোগ করে দিতে হবে। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, অন্তঃসত্ত্বা ও অসুস্থ যাত্রীদের পাশাপাশি কোলে শিশু নিয়ে যাঁরা ভ্রমণ করছেন, তাঁদের বসার প্রয়োজন হলে আসন ছেড়ে দেওয়া উচিত। সংরক্ষিত আসনগুলোও যাঁদের জন্য নির্ধারিত, তাঁদের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে ব্যবহার করতে হবে।

ট্রেনের ভেতরে উচ্চ স্বরে কথা বলা, অযথা হইচই করা কিংবা ফোনের স্পিকারে গান ও ভিডিও চালানো থেকে বিরত থাকো। সবাই একই পরিবেশে যাতায়াত করছেন। কেউ হয়তো ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছেন, কেউ বই পড়ছেন, আবার কেউ জরুরি কাজে ব্যস্ত। তাই ফোনে কথা বলার সময় স্বাভাবিক স্বরে কথা বলো। গান বা ভিডিও দেখতে চাইলে হেডফোন ব্যবহার করো।

মেট্রোরেলের ছাদে ওঠা কেন এত বিপজ্জনক

খাবার খাওয়া ও ময়লা ফেলা নিষেধ

মেট্রোরেল স্টেশন ও ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে খাবার খাওয়া, থুতু ফেলা কিংবা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার বিষয়ে নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে। খাবারের প্যাকেট, কাগজ বা অন্য কোনো বর্জ্য ফেলে পরিবেশ নোংরা করা যাবে না। স্টেশন ও ট্রেনের ভেতরে ধূমপানও নিষিদ্ধ।

একটি জায়গা পরিষ্কার রাখা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্ব নয়। যাঁরা জায়গাটি ব্যবহার করছেন, তাঁদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাই নিজের ব্যবহারের পর জায়গাটি পরিচ্ছন্ন রাখো। ছোট্ট একটি কাগজ বা খাবারের প্যাকেট যেখানে-সেখানে ফেলে রাখলেও পরিবেশ নোংরা হয়। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

নিয়ম না মানলে জরিমানা হতে পারে

মেট্রোরেলে যাতায়াতের সময় শুধু শিষ্টাচার নয়, টিকিট ও ভাড়াসংক্রান্ত নিয়মও মেনে চলতে হবে। নির্ধারিত ভাড়া এড়িয়ে যাওয়া কিংবা টিকিটের নিয়ম ভাঙলে জরিমানা হতে পারে। প্রথম আলোর ২২ জুন ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত ফাবিহা ফাইজা হকের ‘মেট্রোরেলে এমন আচরণ করছেন না তো’শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত ভাড়ার নিয়ম লঙ্ঘন করলে ভাড়ার ১০ গুণ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

এ ছাড়া মেট্রোরেল এলাকায় নিষিদ্ধ বস্তু বহন, পোস্টার বা ব্যানার লাগানো কিংবা দেয়ালে লেখালেখি করার মতো কাজ থেকেও বিরত থাকতে হবে। নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলো। স্টেশনে কোনো জরুরি ঘোষণা দেওয়া হলে মনোযোগ দিয়ে শোনো।

ছোট ছোট অভ্যাসেই সহজ হবে সবার যাত্রা

মেট্রোরেল আমাদের যাতায়াতের সময় বাঁচায়। কিন্তু এই সুবিধা সবার জন্য স্বস্তিদায়ক করে তুলতে যাত্রীদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। লাইনে দাঁড়ানো, আগে অন্যদের নামতে দেওয়া, ব্যাগ সামলে রাখা, ফোনের আওয়াজ কমানো কিংবা প্রয়োজনের সময় কাউকে আসন ছেড়ে দেওয়া—এমন ছোট ছোট কাজেই বদলে যেতে পারে যাতায়াতের পরিবেশ।

নিয়ম মেনে চলার মানে শুধু জরিমানা এড়িয়ে চলা নয়। এর অর্থ অন্যের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া। তাই পরেরবার মেট্রোরেলে চড়ার সময় নিজের আচরণের দিকে একটু খেয়াল রেখো। তোমার ছোট্ট সচেতনতাই হয়তো অন্য কারও যাত্রাকে আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক করে তুলবে।

এভাবেও পুরান ঢাকায় ঘোরা যায়