বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু নাম বারবার ফিরে এলেও অনেক নাম সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির আড়ালে। তেমনই এক নিভৃতচারী ও বিস্মৃত বীর সিলেটের জকিগঞ্জের তৎকালীন কিশোর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা জহর সেন। রণক্ষেত্রে অসামান্য বীরত্ব দেখালেও তিনি কখনো মুক্তিযোদ্ধার সনদের জন্য আবেদন করেননি, নেননি কোনো রাষ্ট্রীয় পদক। এমনকি নিভৃতে থাকা এই বীরের মৃত্যুর খবরও দীর্ঘকাল অজানাই ছিল।২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সাংবাদিক দেবদুলাল মুন্নার একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জহর সেনের জীবন ও সংগ্রামের গল্পটি পুনরায় আলোচনায় আসে। বর্তমানে ঢাকায় সাংবাদিকতায় যুক্ত দেবদুলাল মুন্না একসময় শ্রীমঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক ছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে জহর সেনকে নিয়ে প্রথম তথ্যভিত্তিক লেখা প্রকাশ করেন এবং পরে ২০২১ সালে সংশোধিত তথ্য তুলে ধরেন।দেবদুলাল মুন্নার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, জহর সেন ছিলেন তৎকালীন সিলেট জেলার জকিগঞ্জ থানার এক সাহসী কিশোর। যুদ্ধের শুরুতে তিনি কুষ্টিয়া অঞ্চলের সম্মুখসমরে অংশ নেন। পরবর্তীতে হবিগঞ্জের বাহুবলে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিভিন্ন সূত্র ও স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন তিনি ১৭ জন পাকিস্তানি সেনা এবং দুই জন আলবদর সদস্যকে খতম করেছিলেন। তবে এ তথ্যের কোনো দাপ্তরিক স্বীকৃতি নেই।দেশ স্বাধীন হলেও জহর সেনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বিষাদময়। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এক নিকটাত্মীয় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই ব্যক্তিগত শোক ও যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির অস্থিরতা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজেকে অনিরাপদ বোধ করায় এবং আক্ষেপ থেকে তিনি কখনো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির পথে হাঁটেননি। নব্বইয়ের দশকে তিনি স্থায়ীভাবে ভারতের আসামের করিমগঞ্জে চলে যান। দীর্ঘ প্রবাস জীবনেও তিনি তার বীরত্বগাথা নিয়ে প্রচারবিমুখ ছিলেন। ২০২৩ সালের ২৪ জুন করিমগঞ্জেই এই বীরের জীবনাবসান ঘটে। দেবদুলাল মুন্না তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন।জহর সেনকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা কাউসার চৌধুরী, কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। জহর সেনের ইতিহাসের অন্যতম সূত্র হলো জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর একান্ত সচিব সালেকউদ্দিন রচিত ‘সিলেটে মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থটি। এছাড়া ১৯৮৮ সালে জহর সেনের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন দেবদুলাল মুন্না, যা তখন ‘প্রিয় প্রজন্ম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত জহর সেনের ঐতিহাসিক ছবিটি তুলেছিলেন ফরাসি আলোকচিত্র সাংবাদিক অ্যান ডি হেনিং। রাষ্ট্রীয় তালিকায় নাম না থাকলেও কিংবা কোনো পদক না পেলেও জহর সেনের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।