বর্ষার শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টাঙ্গাইল, জামালপুরের বকশীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া ও কুড়িগ্রামে শত শত বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নদীভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা ও ক্ষতিপ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যুগান্তর প্রতিনিধিরা জানান : টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার সলিমাবাদ পশ্চিমপাড়া এলাকায় গত ২৩ জুন থেকে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ঘরবাড়ি, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অনেক পরিবার। কেউ খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দাবি, এক সপ্তাহে অন্তত ৫০টি ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিম্নমানের কাজ ও প্রয়োজনীয় পরিমাণ জিওব্যাগ না ফেলায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত লুৎফর ও সুফিয়া বেগমসহ স্থানীয়রা জানান, আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষতি এড়ানো যেত। এখনো ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সহায়তা মেলেনি। এদিকে মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের ইছাপাশা এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ভাঙনে প্রায় সাড়ে তিনশ মিটার এলাকায় ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক পরিবার ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় নেতারা। সলিমাবাদ ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন ভূঞা বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈদ উদ্দিন বলেন, ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ৯ কোটি টাকার চলমান প্রকল্প শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে বর্ষার শুরুতেই জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র, দশানী ও জিঞ্জিরাম নদীর তীব্র ভাঙনে শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার মুখে পড়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। জানা যায়, টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিন নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়ে মেরুরচর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া, খেওয়ারচর, জাগিরপাড়া, ঘুঘরাকান্দি ও বেতমারী, নিলাক্ষিয়া ইউনিয়নের কুশলনগর ও সাজিমারা এবং সাধুরপাড়া ইউনিয়নের আইড়মারী ও কুতুবেরচর এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় শতাধিক বসতভিটা, বিপুল ফসলি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ইউএনও মুরাদ হোসেন বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে। ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করতেই রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তার পানি কমলেও প্রবল স্রোতে নদীতীর ভেঙে পড়ছে। ভাঙনের আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে বাদশা মিয়া, এরশাদ আলী, জয়নাল আবেদীন, আব্দুল হামিদ, জুয়েল মিয়াসহ অন্তত ২০টি পরিবারের ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভাঙনের মুখে এখন ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামে মসজিদ, ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসাসহ আরও প্রায় অর্ধশত পরিবারের বাড়িঘর। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, বহুবার নদীভাঙন দেখলেও এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। ক্ষতিগ্রস্ত বাদশা মিয়া বলেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চর ঢুষমারা একসময় মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে। জয়নাল আবেদীন বলেন, তারা ত্রাণ নয়, স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চান। আবেদ আলী অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে নদীভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে জনপ্রতিনিধিরা আর খোঁজ নেন না। কুড়িগ্রামে ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি দ্রুত কমতে শুরু করলেও বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন নদীতে ৩৫টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দেওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে উজানের ঢল ও বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। পানি কমলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকায় এখনো পানি জমে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে বন্যার পানিতে জেলার প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির পাট, আমনের বীজতলা, সবজি ও অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।








