উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে গাইবান্ধায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি দ্রুতই বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। এতে বিলীন হয়েছে আবাদি জমি ও অনেক বসতভিটা। ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে স্কুল, মাদ্রাসা এবং দোকানসহ অসংখ্য স্থাপনা। 

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, বুধবার (১ জুলাই) তিস্তার পানি (কাউনিয়া পয়েন্ট) বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা তারা। 

এছাড়া, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৪২ সেন্টিমিটার ও গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি ১২৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি বলে জানিয়েছে করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম লালচামার গ্রাম, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর। এসব এলাকার অন্তত দুই শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও দেড় শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।  

সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মনজু মিয়া বলেন, “আমার ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ ভয়াবহ নদী ভাঙনের মুখে পড়েছেন। দুই মাস ধরে অব্যাহত ভাঙনে প্রায় ১০০ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। একটি মাদ্রাসা নদী গর্ভে চলে গেছে। প্রায় ৭০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছে নদীতে।”

ফুলছড়ি উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, ফজলুপুর ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর ও চর চৌমোহন।

চর চৌমোহনে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ইতোমধ্যে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ চরের ভাঙনের শিকার মানুষ ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।  এছাড়াও সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামেও নদী ভাঙন শুরু হয়েছে।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব রসুলপুর গ্রামের দিনমজুর মনোয়ারা বেগম বলেন, “নদী ভাঙনে বাপের জমি, বসতভিটা সইগ (সব) গেছে। এখন স্বামীর বসতভিটা যেকনা (যতটুকু) ছিল, তাও শ্যাষ। বাড়ির সামনে সাত শতক জমিতে শাক, সবজি আবাদ করচুনু (করেছিলাম), তাও নদীর পেটত গ্যাচে।” 

একই গ্রামে ষাটোর্ধ বৃদ্ধা সাইভান বেওয়া কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, “নদী হামার কিচ্ছু থোয়নাই (রাখেনি) বাওয়া (বাবা)। ৫-৭ বিঘা আবাদি জমি ছিল সেটাও শ্যাষ। নদী হামার সইগ (সবকিছু) শ্যাষ করি দিচে। কেউ একনা খোঁজ খবরও নিব্যার (নিতে) আসেনাই।” 

ফজলুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনছার আলী মন্ডল বলেন, “পানি বাড়ার শুরু থেকেই এই ইউনিয়নের অনেকগুলো এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর ও চর চৌমোহনসহ কয়েটটি এলাকার অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়েছেন।”  

সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাইল এলাকায় নদী ভাঙনে ইতোমধ্যে ৩০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভাঙনের মুখে আছে আরো অনেক পরিবার। সেখানকার একমাত্র সিধাইল কওমি মাদরাসটিও রয়েছে ভাঙনের মুখে। 

রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আগামী বুধবার থেকে উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধাসহ কয়েকটি জেলায় বৃষ্টিপাত টানা তিন থেকে চার দিন অব্যাহত থাকতে পারে। ”

তার মতে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, “পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জেলার নদী তীরবর্তী অঞ্চল ও চরাঞ্চলে ২০ থেকে ২৫টি স্পটে ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত এলাকায় কাজ করছি।”