২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। কয়েকজন সহকর্মী একসঙ্গে পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর উদ্দেশে রওনা হই। লক্ষ্য ছিল একটি অভিযোগের অনুসন্ধান। অভিযোগ ছিল রাঙ্গাবালী সদর ইউনিয়নের সেই সময়ের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান খান ওরফে মামুন খানের বিরুদ্ধে। শোনা যাচ্ছিল, তিনি জেলেদের মৃত দেখিয়ে এবং ভুয়া নাম ব্যবহার করে সরকারি চাল আত্মসাৎ করেছেন।

রাঙ্গাবালী পৌঁছে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা ও স্থানীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আরও চমকপ্রদ তথ্য। তাঁরা জানান, উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে জেলেদের মাছ ধরার এলাকাগুলো মৌখিকভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে রয়েছে মামুন খান ও তাঁর সহযোগীদের প্রভাব।

পরদিন সাংবাদিক কামরুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ছুটে যাই চর হেয়ারে। সেখানে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, চরটি স্থানীয় সংসদ সদস্য মহিব্বুর রহমান ইজারা দিয়েছেন এবং সেই ইজারার টাকা সংগ্রহ করেন মামুন খান ও তাঁর লোকজন। পরে রাঙ্গাবালীতে একের পর এক চর ঘুরে একই ধরনের অভিযোগের সত্যতা পাই।

সব তথ্য সংগ্রহ করে পটুয়াখালী ফিরে মৎস্য বিভাগ, বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলি। তাঁরা জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো চর, সাগর মোহনা বা উন্মুক্ত জলাশয় ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়ম হলো ‘জাল যার, মাছ তার’। কিন্তু বাস্তবে সেখানে গড়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যবস্থা।

এরপর সংসদ সদস্য ও মামুন খানের বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন পাঠাই ‘আজকের পত্রিকা’র প্রধান কার্যালয়ে। বিষয়টি জেনে মুঈনুল ভাই বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এত বড় বিষয় আগে কেন জানানো হয়নি এবং অন্য কোনো গণমাধ্যম এর অনুসন্ধান করেছে কি না। প্রতিবেদনটি সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয় এ আর চন্দন ভাইকে। তিনি আরও অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুধু রাঙ্গাবালী নয়, এমপির নিজ এলাকা কলাপাড়া এবং কুয়াকাটার বিভিন্ন চর ও সাগর মোহনায়ও অনুসন্ধান চালাতে হবে।

এরপর কুয়াকাটার সহকর্মী আসাদুজ্জামান মিরাজের সহায়তায় যোগাযোগ করি ধুলাসার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা জলিল মাস্টারের সঙ্গে। তিনি এমপি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন চর ও সাগর মোহনা নিয়ন্ত্রণ এবং কথিত ইজারা ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য দেন।

এরপর দীর্ঘদিন ধরে সরেজমিন অনুসন্ধান চালাই। চর বিজয়, কাউয়ার চরসহ কলাপাড়া ও কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও প্রমাণ সংগ্রহ করি। সব তথ্য-উপাত্ত চন্দন ভাইয়ের কাছে পাঠালে তিনি একাধিকবার ক্রস চেক করিয়ে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেন।

অবশেষে ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর আজকের পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘সাগর “ইজারা” দিয়েছেন এমপি’ শিরোনামে শীর্ষ সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয়।

দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যায় পত্রিকা এবং আজকের পত্রিকার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ফটোকার্ড ভাইরাল হয়। শুরু হয় দেশজুড়ে আলোচনা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসতে থাকে। মানুষজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন লেখা দিয়ে নিউজটি প্রচার করতে থাকেন। সরকারের উচ্চ মহল ও প্রশাসনের টনক নড়ে, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও যোগাযোগ করতে থাকেন।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি শুরু হয় চাপ, ভয়ভীতি ও অপপ্রচার। এমপি ও তাঁর অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ ছড়াতে থাকেন। রাঙ্গাবালীর সাংবাদিক কামরুল হাসান, তথ্যদাতা জেলেরা এবং আমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোর্স জলিল মাস্টার এবং প্রত্যক্ষদর্শী বক্তব্যদানকারী ইউপি সদস্য আনোয়ার ফকিরের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়।

পরদিন জলিল মাস্টারকে কলাপাড়ায় নিয়ে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে উপজেলা আওয়ামী লীগ। একই ধরনের সংবাদ সম্মেলন হয় রাঙ্গাবালীতেও। এমনকি আমার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন সদস্য সতর্ক করে জানান, এই প্রতিবেদনের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

একপর্যায়ে জলিল মাস্টার আমাকে ফোন করে জানান, তাঁকে ভয়ভীতি দেখানোসহ এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি তখন ভীষণ অসহায় অবস্থায় ছিলেন। বিষয়টি আমি অফিসে জানালে মুঈনুল ভাই এবং তৎকালীন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান আমাকে আশ্বস্ত করেন, অফিস আমার পাশে রয়েছে।

এর মধ্যেই আমি ওই এমপিকে নিয়ে আরও অনুসন্ধান শুরু করি। বিভিন্ন জায়গা থেকে আরও বিস্ময়কর তথ্য আসতে থাকে। বিষয়টি জানতে পেরে এমপির বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষী, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে অনুরোধ পাঠানো হয়, যেন আমি নতুন কোনো প্রতিবেদন আর না করি। তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ করারও আগ্রহ দেখান।

তবে আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিই, যেসব জেলে, স্থানীয় মানুষ এবং তথ্যদাতারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বের অবসান হয়। যদিও এই প্রতিবেদনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও করেননি ওই এমপি।

তবে আমার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিই দেখি। কারণ, এটি প্রকাশের পর দেশের সাগর, নদী ও উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় চলমান অবৈধ ইজারা প্রথা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং অনেক জায়গায় সেই অনিয়ম বন্ধ হয়ে যায়।

লেখক: পটুয়াখালী প্রতিনিধি