নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় আকস্মিক বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। তবে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেঙে গেছে সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি, নষ্ট হয়েছে কৃষকদের আমনের বীজতলা, ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ। ফলে পানি কমলেও দুই উপজেলার মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ভারী বর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী, মহাদেও, গণেশ্বরী, নেতাই ও উব্দাখালী নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে কলমাকান্দার লেংগুরা, খারনই, রংছাতি ও নাজিরপুর এবং দুর্গাপুরের গাঁওকান্দিয়া, কুল্লাগড়া ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের শত শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সোমবার সরেজমিন কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বন্যার পানি অনেকটাই নেমে গেলেও সর্বত্র রয়ে গেছে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কোথাও সড়ক ধসে গেছে, কোথাও বিদ্যালয়ের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কোথাও বালিতে ঢেকে গেছে কৃষকদের বীজতলা। অনেক পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র মৎস্যচাষিরাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কলমাকান্দা উপজেলার খারনই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক বলেন, ‘এই আকস্মিক বন্যায় আমাদের ইউনিয়নের প্রায় ১২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। খারনই থেকে উপজেলা সদরে যাওয়ার পাকা সড়কের বিভিন্ন অংশ পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত আড়াই কিলোমিটার সড়ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মানুষের চলাচলে মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়নের প্রায় ৭০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং ২০০ থেকে ২৫০ জন কৃষকের আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে।’

নলছাপড়া এলাকার বাসিন্দা সজল মিয়া বলেন, ‘নলছাপড়া বাজারের সড়কের প্রায় ১৫০ ফুট অংশ পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেঙে গেছে। ফলে বাজার এবং নলছাপড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।’

বন্যায় কলমাকান্দার গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল আযম বলেন, ‘বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। দ্রুত বিদ্যালয়টি মেরামত করে পাঠদান চালুর ব্যবস্থা করা হবে।’

দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের বন্দউশান গ্রামের কৃষক রুস্তম আলী বলেন, ‘আমার আট শতক জমির আমনের বীজতলা এক রাতেই নষ্ট হয়ে গেছে। উজান থেকে আসা বন্যার পানির সঙ্গে আসা বালিতে পুরো বীজতলা ঢেকে গেছে। এখন আবার নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া আমার একটি পুকুরের মাছও পানিতে ভেসে গেছে, গ্রামের প্রায় সব পুকুরের মাছও ভেসে গেছে।’

দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। গাঁওকান্দিয়ায় একটি মসজিদ ভাঙনের মুখে রয়েছে। এ ছাড়া কৃষকদের পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়া ও বীজতলা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সরেজমিন দেখেছি। এ বিষয়ে সমন্বিত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।’

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কলমাকান্দার উব্দাখালী নদীর পানি গতকাল বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও আজ তা ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি নেমে যাওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হচ্ছে। দুর্গাপুরের গাঁওকান্দিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ আগামী বছরের বন্যার আগেই মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শামসুযযামান আসিফ বলেন, ‘বন্যায় কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি মসজিদ এবং বিভিন্ন সড়কের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে বীজতলা। গত দুই দিন ধরে আমরা সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেছি। আগামীকালের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হবে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলে একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। তারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত, কৃষকদের পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে সীমান্তবর্তী এই দুই উপজেলার মানুষকে প্রতি বছরই একই দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

এ দিকে গতকাল মঙ্গলবার কলমাকান্দায় পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট ও বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন ডেপুটি স্পিকার ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমরা স্থানীয়ভাবে আলোচনা করেছি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সে জন্য আপাতত স্থানীয় একজন ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় অস্থায়ীভাবে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

তিনি জানান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইতিমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করেছেন। শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের জন্য একটি স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে।

বর্তমান ভবন সংস্কারের পরিবর্তে নতুন স্থানে বিদ্যালয় স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান স্থানে বিদ্যালয়টি সংস্কার করা হলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আবারও পাহাড়ি ঢল বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি উদ্যোগে পর্যাপ্ত জায়গা নির্বাচন করে সম্পূর্ণ নতুন স্থানে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করা হবে। আমি নিজে শিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করব।’

ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট পরিদর্শন শেষে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘এলজিইডির প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পরিদর্শন করছেন। জরুরি ভিত্তিতে সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার ক্ষতি কমাতে এ অঞ্চলে সাবমার্সিবল সড়ক নির্মাণের বিষয়টি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।’

পরিদর্শনকালে নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল আজম, লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া, খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।