দেশের ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) প্রায় ২২ মাস ধরে নির্বাচিত নেতৃত্ব ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও এখনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ সুদহার, কর-ভ্যাটের চাপ, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষে সরকারের সঙ্গে কার্যকরভাবে নীতিগত সংলাপ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অর্থনীতি যখন একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন ব্যবসায়ী সমাজের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনটি নির্বাচিত নেতৃত্ববিহীন থাকায় বেসরকারি খাতের নীতি-সহায়তা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই শূন্যতা আরো স্পষ্ট।
বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকের মাধ্যমে এফবিসিসিআইয়ের নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে, ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা, সরকারের সঙ্গে নীতিগত দরকষাকষি এবং ব্যবসাবান্ধব সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচিত নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর এফবিসিসিআইয়ের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করলে ১১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পর্ষদ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমানকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
তার দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। তবে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্ভব না হওয়ায় কয়েক দফা তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকেও ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি আবদুর রহিম খানকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। ফলে প্রশাসক পদে নতুন নিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরো বিলম্বিত করতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
বিধিমালা সংশোধনেই আটকে নির্বাচন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের কাজ শেষ না হওয়ায় এফবিসিসিআই নির্বাচন ঝুলে আছে।
সংস্কার প্রস্তাবে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ৮০ থেকে কমিয়ে ৪৬-এ নামিয়ে আনা, মনোনীত পরিচালকের সংখ্যা হ্রাস, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে, একাধিক ধারা নিয়ে বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের আপত্তি ওঠে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে নির্বাচন আয়োজন আরো জটিল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে দেশের ৮০টির বেশি চেম্বার এবং চার শতাধিক খাতভিত্তিক বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সদস্য। এসব সংগঠনের প্রতিনিধিরাই ফেডারেশনের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন করেন। ফলে কেন্দ্রীয় নির্বাচন আটকে থাকায় অনেক সহযোগী সংগঠনের নির্বাচনও বিলম্বিত হচ্ছে।
অর্থনীতির কঠিন সময়ে নেতৃত্বের শূন্যতা ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়েছে, জ্বালানি ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা রয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কর ও ভ্যাটের চাপও কমেনি। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ব্যবসায় নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, বাজেট, করনীতি, শিল্পনীতি, রপ্তানি ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবসায়ীদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য শক্তিশালী ও নির্বাচিত নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সম্প্রতি ব্যবসায়ী নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে একজন ব্যবসায়ী প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাব দেন। তাদের যুক্তি, একজন ক্যারিয়ার আমলা প্রশাসনিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারলেও ব্যবসার বাস্তবতা, বাজারের সংকট এবং উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো একজন ব্যবসায়ীর মতো গভীরভাবে উপলব্ধি করা কঠিন।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, “দেশের সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী সংগঠন দীর্ঘদিন নির্বাচিত নেতৃত্বহীন থাকায় ব্যবসায়ীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এফবিসিসিআই সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের প্রধান মুখপাত্র। সেই জায়গাটি দীর্ঘদিন কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো বেসরকারি খাত।”
তিনি বলেন, “সংস্কার প্রয়োজন, তবে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন বন্ধ রাখার কারণ হতে পারে না। দ্রুত সংস্কার শেষ করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা উচিত।”
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “ক্ষুদ্র থেকে বড়, সব ধরনের ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষার কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে এফবিসিসিআই। দীর্ঘদিন নির্বাচিত পর্ষদ না থাকায় ব্যবসায়ীরা কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই দ্রুত বিধিমালা চূড়ান্ত করে নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন।”
সংগঠনটির সাবেক পরিচালক হাজী মো. আবুল হাশেম বলেন, “প্রশাসকের মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজ চললেও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীকে প্রশাসক করা হলে সদস্যদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং নির্বাচন আয়োজনও সহজ হবে।”
চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্ভব এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও সরকারের সচিব আবদুর রহিম খান বলেন, “ঈদুল আজহার পর নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ছিল। তবে, বিধিমালার সংশোধনী চূড়ান্ত না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।”
তিনি বলেন, “সংশোধনী কার্যক্রম শেষ হলে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, তফসিল ঘোষণা এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। যেকোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের জন্য নির্বাচিত নের্তৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব থাকলে সংগঠন আরো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।”
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, দীর্ঘদিনের এই নেতৃত্ব শূন্যতা শুধু একটি সংগঠনের সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশেও প্রভাব ফেলছে।
তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কর নীতি, শিল্পায়ন, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান নিয়ে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত কার্যকর সংলাপ জরুরি। আর সে জন্য এফবিসিসিআইতে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।








