সম্প্রতি খুলনা মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগী, সক্রিয়, মামলা-হামলার শিকার এবং আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকা নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অপরিচিত, নিষ্ক্রিয় ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিএনপির বিভিন্ন কমিটিতে থাকা ব্যক্তিদেরও যুবদলের ওয়ার্ড কমিটিতে স্থান দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তৃণমূল নেতারা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। পাশাপাশি বাদ পড়া ও বঞ্চিত ত্যাগী নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।
মহানগর যুবদলের সাবেক ও বর্তমান একাধিক নেতার অভিযোগ, সদ্য ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটিগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি নেতাকর্মী তৃণমূলের কাছে অপরিচিত। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা, দীর্ঘদিন কারাবরণ এবং মামলা-হামলার শিকার নেতাদের বাদ দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিদেরও কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মাদক কারবারের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নেতাকর্মীরা।
যুবদলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়েছে হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত রাফসান জামিলকে। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক করা হয়েছে উজ্জল দাসকে। তার বিরুদ্ধে মাদক মামলায় কারাভোগসহ একাধিক মামলায় আসামি থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি নেতাকর্মীদের।
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পদে জামালকে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক বিপ্লবের বিরুদ্ধে মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
২১ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পাওয়া রকি ইসলাম রনির বিরুদ্ধেও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করেছেন তারা। ২২ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ স্থানীয় নেতাকর্মীদের। ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধেও অতীতে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, অতীতে যুবলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়া, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির ২৪ নম্বর সদস্য হিসেবে কওছারউদ্দিন সুমনকে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অতীতে র্যাবের হাতে তার গ্রেপ্তার হওয়ার কথাও নেতাকর্মীরা উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। সাবেক ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল সভাপতি ও সোনাডাঙ্গা থানা যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী রফিকুল ইসলাম শান্ত বলেন, “দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেককেই কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। অথচ, তৃণমূলের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, এমন অনেককে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে।’
কারাগারে থাকা অবস্থায় সন্তানের জন্ম এবং পরে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়া ৩১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর থানা যুবদলের পদপ্রত্যাশী ইয়াকুব আলীও নতুন কমিটিতে কোনো পদ পাননি। তিনি বলেন, “কারাগারে থাকা অবস্থায় আমার সন্তানের জন্ম হয়েছে। পরে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সন্তানের জানাজায় অংশ নিয়েছি। দলের দুঃসময়ে রাজপথে ছিলাম। অথচ, নতুন কমিটির কাউকেই আমি চিনি না। আমাকে কোথাও রাখা হয়নি।”
একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদ্য সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আল মামুনও কমিটিতে স্থান পাননি। একসময় সম্ভাবনাময় ফুটবল তারকা হিসেবে পরিচিত হাসান আল মামুন বিএনপির দুঃসময়ে দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন বলে নেতাকর্মীরা জানান। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়ার কারণে তিনি নির্যাতন ও নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। বর্তমানে জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি ইজিবাইক চালাচ্ছেন।
হাসান আল মামুন বলেন, “দলের দুঃসময়ে রাজপথে ছিলাম। আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক কিছু হারিয়েছি। এখন জীবিকার জন্য ইজিবাইক চালাই। দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেও কমিটিতে জায়গা হয়নি এটা কষ্টের।”
মহানগর যুবদলের সাবেক সহ-সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, ‘বিগত সময়ে যখন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করা কঠিন ছিল, তখনও অনেক নেতাকর্মী মাঠে ছিলেন। অনেকে হামলার শিকার হয়েছেন, একাধিক মামলায় আসামি হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। কমিটি ঘোষণার সময় তাদের অনেককেই মূল্যায়ন করা হয়নি। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম রুবেল বলেন, “একাধিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। সে তুলনায় খুঁটি নাটি কিছু কথা উঠেছে। তবে ঘোষিত কমিটি একেবারে স্বচ্ছ। কোন ত্যাগিরা বাদ পড়লে তারা থানা কমিটিতে স্থান পাবে।”
বির্তকিতদের ব্যাপারে তিনি বলেন, “জঙ্গী সংগঠন বা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে কোন সম্পৃক্ততা পেলে অবশ্যই অভিযুক্তদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”








