উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের কথা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার, অলস জীবনযাপন বা ধূমপানের মতো চেনা বদভ্যাসগুলোর ছবি। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি, প্রতিদিন জীবন বাঁচাতে যে পানি আমরা পান করছি, তা–ই সবার অজান্তে কোটি কোটি মানুষের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছে। আর এর ফলে সাগরের লোনা জল উপচে ঢুকে পড়ছে আমাদের মিষ্টি পানির প্রধান উৎসে। ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য গবেষক অধ্যাপক রাজীব চৌধুরী ও তাঁর দলের সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণের অনধিকার প্রবেশ বিশ্বজুড়ে হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটির বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রধান কারণ। অথচ বিশ্বব্যাপী এই রোগ প্রতিরোধের জন্য মানুষ কেবল জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে কাজ করছেন। আসল ঝুঁকির দিকে খুব কমই নজর দেওয়া হয়।
গবেষকদের তথ্যমতে, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় মাটির নিচের পানি দিন দিন লবণাক্ত হয়ে উঠছে। বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটির বেশি মানুষ উপকূলীয় বা তার কাছাকাছি অঞ্চলে বসবাস করেন, যাঁদের একটি বড় অংশ আবার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো ভূগর্ভস্থ পানি। অথচ রান্নাবান্না কিংবা তৃষ্ণা মেটানোর সময় তাঁরা অজান্তেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করাচ্ছেন, যার অনেক সময় নোনতা স্বাদও মুখে টের পাওয়া যায় না।
খাবার পানিতে লবণের তীব্রতা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা জানতে অধ্যাপক রাজীব চৌধুরীর দল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কেনিয়া ও বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশের ৭৪ হাজারের বেশি মানুষের ওপর করা ২৭টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণার তথ্য–উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে। গবেষণার ফলাফল ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভীতিকর। যাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি লবণাক্ত পানি পান করছেন, তাঁদের সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৩ দশমিক ২২ মিমি–এইচজি এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ২ দশমিক ৮২ মিমি–এইচজি বেশি থাকে।
সামগ্রিকভাবে লোনা পানি পানের কারণে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রকোপ সবচেয়ে মারাত্মক। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই রক্তচাপ বৃদ্ধির হার কম মনে হলেও বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর এর সম্মিলিত প্রভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট বিপর্যয়। তুলনা করতে গেলে শরীরে লোনা পানির এই ক্ষতিকর প্রভাব অলস বা কায়িক শ্রমহীন জীবনযাপনের মতোই বিপজ্জনক। এই ক্ষতিকর প্রভাব রক্তচাপের ঝুঁকি ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়াতে পারে।
লবণাক্ত পানির সঙ্গে রক্তচাপের এই যোগসূত্র প্রমাণিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি মানুষের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কতটা বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত গবেষণার অভাব রয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান নির্দেশিকায় পানের যোগ্য পানিতে সোডিয়ামের মাত্রার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
সাধারণ মানুষের জন্য সোডিয়ামের প্রধান উৎস অবশ্যই খাবার। কিন্তু উপকূলীয় এলাকার পানি যদি লবণাক্ত হয়ে এক-তৃতীয়াংশ সোডিয়ামের জোগান দেয়, তবে তা রক্তের জন্য লাল সংকেত। নিজের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন থেকে শুধু পাতে লবণ খাওয়া কমানো নয়; বরং নিজের এলাকার পানির গুণগত মান কেমন, তা–ও পরীক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট







