পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল কারসাজি, পরীক্ষার ডেটাবেইসে অননুমোদিত প্রবেশ, ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং সংগঠিত পরীক্ষা অপরাধের শাস্তির বিধান রেখে একটি বিল সংসদে উঠেছে। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে পাবলিক এক্সামিনেশনস অফেন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬ উত্থাপন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

এর আগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে মুনাফাভিত্তিক বা অ-মুনাফাভিত্তিক কোম্পানি গঠন, কোম্পানির শেয়ার অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের ক্ষমতা দিতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় সংশোধন বিল, ২০২৬ সংসদে তোলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন।

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি অধিকতর পরীক্ষার জন্য তিন বৈঠকি দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার শর্তে বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আর পাবলিক পরীক্ষার অপরাধ সংশোধন বিলটি তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপনের সময় বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান বিলের কপি পাওয়া, তিন দিনের নোটিশের বাধ্যবাধকতা এবং বিলটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো নিয়ে আপত্তি তোলেন।

তিনি বলেন, বিধি অনুযায়ী বিলের কপি তিন দিন আগে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। সেই বাধ্যবাধকতা খণ্ডন করা হলে তা সংসদকে জানানো উচিত।

তিনি আরও বলেন, এটা কিন্তু একটা এক্সেপশনাল মেজার। এ ক্ষেত্রে এটাকে যদি নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে কিন্তু এই ৭৭ বিধির যে স্পিরিটটা আছে, এটা লঙ্ঘন হচ্ছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, বিলের সঙ্গে আগের আইনের তুলনামূলক টেবিল দেওয়ার বিষয়ে স্পিকারের আগের রুলিং ছিল, যাতে সংসদ সদস্যরা দ্রুত পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বিলগুলোর ক্ষেত্রে সে ধরনের টেবিল পাওয়া যাচ্ছে না।

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো নিয়েও আপত্তি জানান তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের তো আইন বিচার সংক্রান্ত একটা কমিটি হয়েছে। এই বিলটা কী এক্সেপশন হলো যে, এটাকে বিশেষ কমিটিতে প্রেরণ করতে হবে?

জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, এই বিলের ক্ষেত্রে সব পূর্বশর্ত পূরণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ জুন নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ২৩ জুন বিল পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের কাছে যে রেকর্ড আছে, সেই রেকর্ড মোতাবেক তিন দিনের আগেই নোটিসগুলো দেওয়া হয়েছে এবং কপি দেওয়া হয়েছে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের সংসদ সদস্যরা বিলের কপি পাননি। জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, রেকর্ড অনুযায়ী বিল টেবিলে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয় বিবেচনা করা হবে।

পাবলিক পরীক্ষার অপরাধ সংশোধন বিলে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ বা ডিজিটাল কারসাজির সংজ্ঞা যুক্ত করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, পাবলিক পরীক্ষার ডেটাবেইসে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং, পরিবর্তন, সংশোধন, মুছে ফেলা বা গোপন করা ডিজিটাল কারসাজির আওতায় পড়বে।

নতুন ধারা ৫এ অনুযায়ী, ডিজিটাল কারসাজি করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রায় ৪৫ বছর আগে পাবলিক পরীক্ষায় নকল, প্রশ্নফাঁস, জাল সনদ এবং অনিয়ম প্রতিরোধে ১৯৮০ সালের আইনটি করা হয়েছিল। বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরীক্ষা সংক্রান্ত অপরাধ বাড়ায় বিদ্যমান আইন সময়োপযোগী করা প্রয়োজন।

বিলে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ বা প্রবেশের চেষ্টা এবং পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত বৈধ নির্দেশনা অমান্যের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন ধারা ৩এ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্র বা পরীক্ষার হলে প্রবেশ করলে বা প্রবেশের চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।

পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের বৈধ নির্দেশনা, বিধি বা নির্দেশ অমান্য করলেও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

বিদ্যমান আইনে প্রশ্ন প্রকাশ, বিতরণ বা প্রচার সংক্রান্ত ধারায় ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম’ যুক্ত করা হচ্ছে।

বিলে বলা হয়েছে, যে কেউ প্রশ্নপত্র বা সংশ্লিষ্ট বিষয় কোনো উপায়ে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ, নিজের কাছে রাখলে, প্রকাশ করলে বা বিতরণ করলে শাস্তির আওতায় আসবে।

তবে বিদ্যমান আইনের কয়েকটি ধারায় শাস্তির মেয়াদ কমিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করার প্রস্তাবও আছে। সংশ্লিষ্ট ধারায় আগে যেখানে ১০ বছর বা সাত বছরের কারাদণ্ড ছিল, তা সংশোধন করে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিলে সংগঠিত পরীক্ষা অপরাধ নামে নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই ধারা অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষার্থীকে অসদুপায় অবলম্বনে সহায়তার উদ্দেশে পরীক্ষার্থী বা তাঁর পক্ষে অন্য কারও সঙ্গে লিখিত বা মৌখিক চুক্তি, সমঝোতা বা ব্যবস্থায় যুক্ত হলে তা অপরাধ হবে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে পরীক্ষা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারীর দায়ও নির্ধারণ করা হচ্ছে। তাদের সহায়তা, যোগসাজশ বা ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডের কারণে অপরাধ সংঘটিত হলে প্রতিষ্ঠান বা সেবা প্রদানকারী অর্থদণ্ডের মুখোমুখি হবে।

প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ডিবারমেন্ট, লাইসেন্স স্থগিত বা কালো তালিকাভুক্ত করার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিলে উত্তরপত্রের অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নকেও অপরাধ হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন ধারা ১০এ অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি বা কম মূল্যায়ন করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। তবে তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন নির্ধারিত না হলে কাউকে এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

বিলে শিশুদের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। কোনো শিশু এই আইনের কোনো বিধানের সঙ্গে সংঘাতে এলে তাকে শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।

তথ্যদাতার সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত অপরাধ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিলে তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। তাকে আইনি দায় ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার হাত থেকেও সুরক্ষা দেওয়া হবে। এই সুরক্ষা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য হবে।

মহানগর এলাকায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহানগরের বাইরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া অন্য কোনো আদালত এই আইনের অপরাধ বিচার করতে পারবে না।

এই আইনের অপরাধ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সমন মামলার সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি হবে। আইনের উদ্দেশ্য পূরণে সরকারকে বিধি করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও আছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় সংশোধন বিল, ২০২৬-এর উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা সেবা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি বাড়াতে মুনাফাভিত্তিক বা অ-মুনাফাভিত্তিক কোম্পানি বা সংগঠন গঠনের বিধান করা প্রয়োজন।

বিলে বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা কার্যক্রমের অতিরিক্ত হিসেবে চিকিৎসা সেবার পরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে মুনাফাভিত্তিক বা অ-মুনাফাভিত্তিক কোম্পানি গঠনের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে দাতব্য কর্মসূচি পরিচালনার জন্য অন্য কোনো আইনের অধীনে সংগঠনও গঠন করতে পারবে। এ ধরনের কার্যক্রম থেকে পাওয়া আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যয় করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে যে কোনো কোম্পানির শেয়ার অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

কোম্পানি গঠন, শেয়ার অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তর, পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধি মনোনয়ন সংক্রান্ত পদ্ধতি ও শর্তাবলি নির্ধারণের জন্য সংবিধি করার ক্ষমতাও যুক্ত করা হচ্ছে।

বিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ স্থাপন করা হয়েছে।

হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও চিকিৎসকসহ সহায়ক জনবল নিয়োগ না হওয়া এবং পরিচালনার পদ্ধতি সুস্পষ্ট না থাকায় এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালটি চালুর লক্ষ্যে সুস্পষ্ট পরিচালনা পদ্ধতি ও জনবল নিয়োগ প্রয়োজন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় হাসপাতালটিকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয় বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও উচ্চতর চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ করবে বলেও বিলে বলা হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, শিক্ষক ও গবেষকদের চুক্তিভিত্তিক সম্পৃক্ততার সুযোগও তৈরি হবে। এ ধরনের কার্যক্রম থেকে পাওয়া আয় চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় পুনঃবিনিয়োগ করা যাবে।