পাবনার হাট-বাজারে পাটের দাম কমছে প্রতিদিন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি পাটের দাম কমেছে প্রায় ৬০০ টাকা। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৪০০ থেকে তিন হাজার ৬০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের উৎপাদন খরচের তুলনায় এই দাম অনেক কম। বাম্পার ফলনের পরও কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা। সিন্ডিকেটের হাতেই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাবনায় ৪৩ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৩৬৫ হেক্টর বেশি। অনুকূল আবহাওয়ায় প্রতি হেক্টরে গড় ফলন হয়েছে ২.৮০ টন, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২.৫০ টন। ফলে জেলায় মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ হাজার ৫০৫ টন বেশি।উৎপাদিত পাটের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ‘এ’ গ্রেড, ২০ শতাংশ ‘বি’ গ্রেড, ৪০ শতাংশ ‘সি’ গ্রেড এবং বাকি ৩০ শতাংশ ‘ক্রস’ ও ‘এসএমআর’ মানের। ভালো মানের পাটেরও দাম কমেছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।বেড়া উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের কৃষক হাফিজ উদ্দিন জানান, দুই একর (ছয় বিঘা) জমিতে তোষা পাট চাষ করে তিনি ৪৮ মণ পেয়েছেন। উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৭ হাজার টাকা লোকসান।হাফিজ বলেন, ‘প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে দীর্ঘদিন পাট মজুদ করে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজনের তাগিদে কম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, তুলনামূলক সচ্ছল কৃষক ও জোতদারেরা পাট গুদামজাত করে রাখছেন। আর মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে উন্নত মানের পাট কিনে মজুদ করছেন। পরে দাম বাড়লে তারা বেশি দামে জুট মিল ও রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করবেন।আতাইকুলা হাটের পাট ব্যবসায়ী সোহরাব হাসান বলেন, পাবনার বিভিন্ন হাট থেকে পাট কিনে খুলনা ও নারায়ণগঞ্জের বড় বড় আড়ৎদার, বেলার ও রপ্তানিকারকদের কাছে সরবরাহ করা হয়। তার দাবি, দেশের পাট বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বড় ব্যবসায়ী চক্র দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।পাট রপ্তানিকারক রেজা জানান, সাধারণ মানের পাট প্রতি মণ ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও উন্নতমানের ‘এ’ ও ‘বি’ গ্রেডের পাট অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তবে অর্থসঙ্কটের কারণে অনেক রফতানিকারক ও বেসরকারি জুট মিল পর্যাপ্ত পাট কিনতে পারছে না।ব্যবসায়ীদের মতে, এ বছর পাটের উৎপাদন ও মান দু’টিই ভালো। কিন্তু অনেক জুট মিল গত বছরের বকেয়া পরিশোধ না করায় নগদ অর্থের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ী, বেলার ও রপ্তানিকারকেরা নতুন করে পাট কিনতে পারছেন না। অন্যদিকে জরুরি অর্থের প্রয়োজন মেটাতে প্রান্তিক কৃষকেরা বাধ্য হয়েই কম দামে পাট বিক্রি করে দিচ্ছেন।বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) সাবেক কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকেরা আর্থিক চাপের কারণে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে পাট বিক্রি করে দেন। পরে একই পাট মজুদদারদের মাধ্যমে বেশি দামে বাজারে আসে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদক কৃষক সেই সুফল পাচ্ছেন না।কৃষি কর্মকর্তারা যদিও দাবি করছেন, মানভেদে কৃষকেরা সন্তোষজনক দাম পাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে প্রান্তিক কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।পাটের এই দামপতন কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। বাম্পার ফলনের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে এই মূল্যসংকট। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পাট বাজারে নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।