এই পৃথিবী, শহর, পরিবেশ—যা কিছু আমাদের চারপাশে আছে, সবকিছুর ওপর অধিকার কি শুধু মানুষের? না, বিভিন্ন প্রাণীরও রয়েছে সুস্থ ও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার। অথচ প্রতিদিনই রাস্তাঘাটে অসুস্থ, আহত ও অপুষ্টিতে ভোগা অসংখ্য প্রাণী দেখা যায়। খাবার, চিকিৎসা কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে তাদের অনেককেই বেঁচে থাকার লড়াই করতে হয়। মানুষের অবহেলা, অসচেতনতা ও নিষ্ঠুরতা তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। পথের এসব অবহেলিত প্রাণীর সুরক্ষা এবং মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তুলতে কাজ করছে ফারি ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশন।
একটি পথপ্রাণীর জন্য সামান্য খাবার, একটু চিকিৎসা কিংবা নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা তার বেঁচে থাকার কারণ হতে পারে। কিন্তু প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো সমাজের সর্বস্তরে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বিশেষ করে পথকুকুর ও বিড়ালের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুর আচরণ, চিকিৎসার সীমিত সুযোগ এবং অনিয়ন্ত্রিত বংশবিস্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ফারি ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি মো. সাকিল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে পথকুকুর ও বিড়ালের ক্ষেত্রে মানুষের যে নিষ্ঠুরতা তা অন্যতম বড় সমস্যা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে সহমর্মিতাকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
মো. সাকিল আহমেদ আরও বলেন, ‘গরমে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, শীতকালে নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও টিকাদান এবং পথকুকুরের অনিয়ন্ত্রিত বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করা জরুরি।’
সংগঠনটির উদ্যোগে চালু করা হয়েছে একটি সিএনভিআর ইউনিট। এর মাধ্যমে পথকুকুরের অনিয়ন্ত্রিত বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি টিকাদান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিরোধে রেবিস ভ্যাকসিনের পাশাপাশি পারভোভাইরাস ও ডিস্টেম্পারের মতো রোগ প্রতিরোধেও টিকাদানের গুরুত্ব রয়েছে। এ ছাড়া পথকুকুরের জটিল রোগের চিকিৎসায় কাজ করছে সংগঠনটি। কুকুরের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে তাদের।

মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একসূত্রে গাঁথা
মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধারণাকে বলা হয় ‘ওয়ান হেলথ’। প্রাণীদের রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত টিকাদান এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে মানুষও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।
এ বিষয়ে মো. সাকিল আহমেদ বলেন, ‘ওয়ান হেলথ মানে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে মানুষও নিরাপদ থাকবে। প্রাণীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া আমাদের নিজেদের স্বার্থেই জরুরি।’
জলাতঙ্ক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পথকুকুরের টিকাদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে ফারি ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশনের জয়েন্ট সেক্রেটারি ফারহাদুজ্জামান বলেন, জলাতঙ্ক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। এ রোগে আক্রান্ত প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত প্রাণী ভয় পেয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে, পানি ও খাবার এড়িয়ে চলতে পারে। তবে সব আক্রান্ত প্রাণীর আচরণ একই রকম হয় না। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। জলাতঙ্কের সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা, আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং কামড় বা আঁচড়ের শিকার হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রাণী–কল্যাণের উদ্যোগ
প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই ফারি ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন তাসনিম সিনহার এ উদ্যোগের সূচনা। পোষা কুকুরের অসুস্থতা, ভুল চিকিৎসা এবং প্রিয় প্রাণীকে হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রাণীদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
একসময় নিজের পোষা কুকুরের চিকিৎসা ও পরিচর্যার অভিজ্ঞতা থেকে তাসনিম সিনহা উপলব্ধি করেন, কুকুরেরও ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগের মতো জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা হতে পারে। এসব রোগের চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রাণীদের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন।
তাসনিম সিনহা বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ফারি ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশন অবহেলিত প্রাণীদের জন্য কাজ করছে। পথপ্রাণীর চিকিৎসা ও সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় শহরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।
প্রাণীদের প্রতি নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাসনিম সিনহা বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রাণীদের প্রতি নির্যাতন বাড়ছে। তাই বিদ্যমান আইন শক্তিশালী করা এবং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।’

শিশুদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে সহমর্মিতা
প্রাণীদের প্রতি মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাণীদের প্রতি যত্নশীল আচরণ, তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং দুর্বল প্রাণীর পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করে।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ফারি ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশন। প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়াই সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।
পথপ্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। যেমন সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, আহত প্রাণীকে চিকিৎসা পেতে সহায়তা করা, অযথা আঘাত করা বা তাড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং প্রাণী নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।
পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, সব প্রাণের। তাই প্রাণীদের সুস্থ ও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণ। ছোট ছোট উদ্যোগও একটি প্রাণীর জীবন বাঁচাতে পারে, গড়ে তুলতে পারে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের জন্য আরও সুস্থ ও নিরাপদ পৃথিবী।







