সামারি: পেরুর মাটি ও পাহাড়ের ঢালে প্রায় ২ হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল বিশাল আকৃতির কিছু নকশা, যেগুলোকে বলা হয় ‘নাজকা লাইনস’ বা ভূচিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিশাল নকশাগুলো আসলে কেন তৈরি করা হয়েছিল?
‘নাজকা লাইনস’ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ভূচিত্র বা জিওগ্লিফ। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে পেরুর শুষ্ক পাহাড় ও উপত্যকায় এই বিশাল নকশাগুলো তৈরি করা হয়েছিল। সে সময় ওই অঞ্চলে কোনো লেখার প্রচলনই ছিল না। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ৫০০ সালের মধ্যে নাজকা সভ্যতার মানুষ এই নকশাগুলো তৈরি করে।
এই রেখাগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৮০০ মাইল বা ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি। এর মধ্যে মানুষ, প্রাণী, গাছপালা, ফুল এবং নানা রকমের জ্যামিতিক নকশা দেখা যায়। ঠিক কতগুলো নাজকা রেখা রয়েছে, তার সঠিক হিসাব এখনো জানা নেই। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, আধুনিক এআইয়ের সাহায্যে আজও নতুন নতুন নকশার সন্ধান মিলছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত কষ্ট করে বিশাল এই নকশাগুলো কেন তৈরি করা হয়েছিল?
সকালে ঘুম থেকে ওঠা মানুষ কি রাত জাগা মানুষের চেয়ে বেশি ভালো
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন বিজ্ঞানীরা এগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তখন থেকেই এ নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি, তবু গবেষকেরা এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আনা নিভেস জানান, এই নকশাগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক রকম ধারণা রয়েছে। নকশাগুলো খুব কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় এগুলোর ধরন ও আকার এক রকম নয়। কোনোটি খুব বড়, কোনোটি ছোট। কিছু পাহাড়ে আঁকা, আবার কিছু সমতল মাটিতে। তাই সব নকশার পেছনের কারণ যে একই ছিল, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

নাজকা রেখা নিয়ে নানা মত
দীর্ঘকাল ধরে এই রহস্যময় রেখাগুলো কেন তৈরি করা হয়েছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা ধরনের তত্ত্ব প্রচলিত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত ধারণাটি হলো, এগুলো নাকি ভিনগ্রহের মহাজাগতিক যান নামার স্থান। তবে বিজ্ঞানীরা এই কল্পকাহিনির বদলে ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
জার্মানির গবেষক কার্স্টেন ল্যাম্বার্স জানান, এই নকশাগুলো কেন তৈরি হয়েছিল তার সঠিক উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, সেকালের কোনো লিখিত বা মৌখিক ব্যাখ্যা আমাদের হাতে নেই। তা ছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গার ব্যবহারের উদ্দেশ্যও বদলে গেছে।
পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়ার পাঁচ সেকেন্ড নিয়মের কি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে
পথ নির্দেশক ও খাবার স্থান
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুরুর দিকে পাহাড়ের ঢালে তৈরি এই নকশাগুলো অনেক দূর থেকেই দেখা যেত। এগুলো সম্ভবত মরুভূমিতে পথ চলার সময় রাস্তা চেনাতে এবং সাময়িক ক্যাম্প করার জায়গা ঠিক করতে সাহায্য করত। পরবর্তী সময়ে এই জায়গাগুলো মানুষ জমায়েত হওয়া ও উৎসব বা ভোজের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
ক্যালেন্ডার বা মহাজাগতিক সংযোগ
১৯৪১ সালে ইতিহাসবিদ পল কোসোক এবং পরবর্তী সময়ে গণিতবিদ মারিয়া রাইখে দীর্ঘদিন গবেষণা করে ধারণা করেছিলেন, এই রেখাগুলো হয়তো কোনো বিশাল ক্যালেন্ডার বা নক্ষত্রের অবস্থান মাপার যন্ত্র হিসেবে কাজ করত। তবে আধুনিক গবেষকেরা বলছেন, খুব অল্পসংখ্যক নকশাই কেবল নক্ষত্র বা সূর্য অবস্থানের সঙ্গে মেলে। তাই পুরো নকশাগুলোকে ক্যালেন্ডার বলা যাবে না। তবে প্রধান গবেষক ক্রিস্টিয়ানে রিখটার জানান, প্রায় ৮ শতাংশ নকশার সঙ্গে চাঁদের গতির পথ মিলে যায়। সুতরাং আকাশের বিভিন্ন গ্রহ বা চাঁদের সঙ্গে এগুলোর একটা সম্পর্ক থাকা অসম্ভব নয়।

উর্বরতা ও আচার-অনুষ্ঠানের স্থান
কিছু নকশার কাছাকাছি পাথরের তৈরি নিচু বেদিতে প্রাচীন মানুষ মৃৎপাত্র, ভুট্টা, কাঁকড়া এবং বিশেষ ধরনের ঝিনুক উপহার হিসেবে রাখত। এসব জিনিস সাধারণত বৃষ্টি, পানি ও মাটির উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো।
এ ছাড়া অধ্যাপক আনা নিভেসের মতে, কিছু নকশা শুধু একটিমাত্র টানা রেখা দিয়ে তৈরি। এই রেখাগুলোর ওপর দিয়ে মানুষ সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যেতে পারত, যা থেকে বোঝা যায় এগুলো ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা আচার-অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হতো।
সম্প্রীতির বন্ধন
অধ্যাপক ড্যারিল উইলকিনসনের মতে, এই বিশাল রেখাগুলোর ওপর দিয়ে একসঙ্গে হাঁটা ছিল একটি দলগত কাজ। এর মাধ্যমে সেকালের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও একসঙ্গে মিলে কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল।
কারণ যা–ই হোক না কেন, নাজকা সভ্যতার মানুষেরা শত শত বছর আগে পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক এই মরুভূমিকে নিজেদের সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের এক চমৎকার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল, যা আজও মানুষকে অবাক করে দেয়।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও লাইভ সায়েন্সযে ১০ অভ্যাস তোমাকে সফল মানুষ করে তুলবে






